মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০২:০৮ পূর্বাহ্ন

প্রভাবশালী নেতাকে এক কোটি ২০ লাখ টাকা দিয়ে যুবলীগের পদ নেন রাজীব

উখিয়া সংবাদ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম :: সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৯
  • ৫৯

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর যুবলীগ নেতা তারেকুজ্জামান রাজীবের উত্থান নিয়ে ভয়াবহ তথ্য উঠে আসছে।

এলাকাবাসী  জানান, ফুটপাতের সামান্য টং দোকানদার ছিলেন রাজীব। সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীর হাত ধরে মোহাম্মদপুরে যুবলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি।

যুবলীগ নেতা রাজীবের উত্থানের পেছনে রয়েছে লম্বা ইতিহাস। ফুটপাতের সামান্য টং দোকানদার ছিলেন রাজীব। সেই যুবলীগ নেতাই এখন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। মালিক হয়েছেন কয়েক কোটি টাকার। তাকে গ্রেফতারের পর বাসা থেকে পাওয়া গেছে ৫ কোটি টাকার চেক। গড়েছেন স্থাবন সম্পত্তি। রয়েছে ঢাকায় বিলাসবহুল একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ফাহিমকে পিটিয়ে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই তিনি যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন।

এ জন্য যুবলীগের কেন্দ্রীয় এক নেতাকে এক কোটি ২০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা পদ পেতে রাজীবের জন্য যুবলীগ চেয়ারম্যানকে একটি ডিও লেটারও দিয়েছেন।

গত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তাকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেয়া হয়নি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীর আশীর্বাদে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এর পর থেকেই মূলত তার ভাগ্য খুলে যায়।

যুবলীগের সাইনবোর্ড আর কাউন্সিলরের পদ ব্যবহার করে এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলেন তিনি। তার বাহিনীর সদস্যরাই এলাকায় কিশোর গ্যাং, মাদক ও ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। মোহাম্মদপুরে যুবলীগ কর্মী তসির উদ্দিন হত্যা মামলার আসামিরাও তারই ঘনিষ্ঠ।

স্থানীয় ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন বলেন, কাউন্সিলর হওয়ার পর এমন কোনো অপকর্ম নেই যা রাজীব করেনি। তার হয়ে যারা চাঁদা আদায় করে তাদের মধ্যে আছে- অভি ফারুক, শাহ আলম, সিএনজি কামাল, ইসরাফিল লাবু প্রমুখ।

তারা ফুটপাত থেকেই প্রতিদিন ৪০-৫০ হাজার টাকা আদায় করছে বলে জামাল উদ্দিন জানান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন ফুটপাত, বেড়িবাঁধ, বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি স্ট্যান্ড, চন্দ্রিমা হাউজিং, সাতমসজিদ হাউজিং, ঢাকা উদ্যানসহ বিভিন্ন এলাকায় দখলবাজি ও চাঁদাবাজিই তার অবৈধ সম্পদের মূল উৎসব।

তার বিরুদ্ধে প্রবাসীদের বাসাসহ এলাকার অনেকের জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে।

মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১ নম্বর রোডে তার যে বিলাসবহুল বাড়ি আছে তার বেশিরভাগ জায়গা সরকারি। পানির পাম্পের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গা দখল করে তিনি বাড়ি বানান।

চাঁন মিয়া হাউজিংয়ের সেখানে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অফিস সেটির মালিকানা জেলা প্রশাসনের। রাজীব তার বাবা এবং স্ত্রীর নামে অনেক সম্পদ করেছেন বলে অভিযানে থাকা একজন র‌্যাব সদস্য জানান।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানান, মোহাম্মদীয়া হাউজিংয়ের ১ নম্বর রোডে রাজীবের যে বাড়িটি রয়েছে সেটি খুবই রাজকীয়।

এ বাড়িটির বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি। বাড়ির আসবাবপত্র থেকে শুরু করে প্রতিটা জিনিস তিনি বিদেশ থেকে আমদানি করেছেন।

এটি তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বলেই ধারণা করা হচ্ছে। কাউন্সিলর হওয়ার আগ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ধরনের ব্যবসা বা পেশা ছিল না। সিটি কর্পোরেশন থেকে যে সম্মানী পায়, সেটিই তার বৈধ আয়। এ ছাড়া বাকি সব অবৈধ লেনদেন।

র‌্যাব কর্মকর্তা সারওয়ার আলম বলেন, কাউন্সিলর হওয়ার পরপরই রাজীব ২০১৬ সালে তিনটি কোম্পানি খুলেছেন। এগুলো হল- সিলিকন, এক্কা এবং নাইমা এন্টারপ্রাইজ। দুঃখজনক হলেও এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে তিনি জমি দখল করেছেন।

কিছু কিছু জায়গায় লোকজনকে অত্যন্ত কম মূল্যে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করেছেন। অপকর্ম করতে গিয়ে রাজীব আত্মীয় ও অনাত্মীয় যেসব লোকজনকে ব্যবহার করেছেন, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

যে জায়গাটিতে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অফিস সেটি জেলা প্রশাসনের বলে আমরা জানতে পেরেছি। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, চলমান শুদ্ধি অভিযানের মুখে গত ১৩ অক্টোবর থেকে আত্মগোপনে ছিলেন রাজীব।

ফারুক নামের স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, রাজীবের বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রি। সেখান থেকে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতার ছত্রছায়ায় কাউন্সিলর হয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন রাজীব।

চাঁদাবাজি আর জমি দখল করে প্রচুর টাকার মালিক হয়েছেন তিনি। মোহাম্মদপুর কাঁচা বাজারের ব্যবসায়ী আবদুল হালিম বলেন, কাঁচা বাজার পুরোটা তার (রাজীব) নিয়ন্ত্রণে।

প্রতি দোকান থেকে দিনে তার লোকজনকে অন্তত ১৫০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। এর চেয়ে বেশিও দিতে হয় কারও কারও।

রাজীব বসবাস করতেন আলিশান বাড়িতে। গুলশান ও মোহাম্মদপুরে আটটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। চড়েন বিলাসবহুল গাড়িতে। যার মধ্যে রয়েছে মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ, ক্রাউন প্রাডো, ল্যান্ডক্রুজার ভি-৮, বিএমডব্লিউ স্পোর্টস কারও।

সাবেক একজন প্রতিমন্ত্রীর হাত ধরে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হওয়া রাজীব ২০১৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাউন্সিলর পদে জয়লাভ করেন। এর পর থেকেই মূলত ভাগ্য আরও খুলে যায় তার। আর পিছু তাকাতে হয়নি তাকে।

রাজীবকে গ্রেফতারের পর র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরওয়ার আলম বলেন, রাজীবের একটি রাজকীয় বাড়ি রয়েছে। এ বাড়িটির বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকার মতো। বাড়ির প্রত্যেকটা আসবাবপত্র থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা জিনিস তিনি বাহির থেকে আমদানি করে নিয়ে এসেছেন। এটি তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বলে আমাদের মনে হয়েছে। তার কিন্তু আসলে কাউন্সিলর হওয়ার আগ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ধরনের ব্যবসা বা পেশা ছিল না। সিটি কর্পোরেশন থেকে যে সম্মানী পায়, সেটি তার প্রধান আয়। এ ছাড়া বাকি সব অবৈধ লেনদেন।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতার ‘কথিত’ ছেলে রাজীব। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে রাজত্ব গড়ে তুলেছেন তিনি। এলাকায় নিয়ন্ত্রণ করেন চাঁদাবাজি। বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি স্ট্যান্ড, ফুটপাতই তার চাঁদা তোলার মূল উৎস।

যুবলীগের সাইনবোর্ড আর কাউন্সিলরের পদটি ব্যবহার করে এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেছেন রাজীব। এর মাধ্যমে দখলদারিত্ব ও টেন্ডারবাজি করেন তিনি। মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১ নং রোড এলাকায় পানির পাম্পের জন্য নির্ধারিত জায়গায় বাড়ি বানান। তার ইশারাতেই রহিম ব্যাপারী ঘাটের ৩৩ নং ওয়ার্ড যুবলীগের অফিসটিও দখল করা। এছাড়া এলাকায় কিশোর গ্যাং, মাদক ও ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন এ সন্ত্রাসী।

২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটির নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন রাজীব। দলীয় প্রার্থী ও মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি শেখ বজলুর রহমানকে হারিয়ে নির্বাচিত হন তিনি।

মোহাম্মদপুর এলাকায় যুবলীগের রাজনীতি দিয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু রাজীবের। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের সান্নিধ্যে অল্পদিনের মধ্যেই মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক পদে বসেন তিনি। পরে বনে যান ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। মোহাম্মদপুরে যুবলীগ কর্মী তছির উদ্দিন হত্যা মামলার আসামিরা তারই ঘনিষ্ঠ। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে খুন করা হয়।

এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বসুন্ধরার ওই বাড়িতে অভিযান চালায় র‌্যাব। সেখান থেকে রাজীবকে গ্রেফতার করা হয়। ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান শুরুর পর আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।

শনিবার রাতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার চার নম্বর সড়কের ৪০৪ নম্বর বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয় রাজীবকে। পরে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম এক তাৎক্ষণিক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, জমিদখল, সন্ত্রাসবাদ, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে রাজীবকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15