বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১১:১৪ পূর্বাহ্ন

৮ বছরের বন্দী জীবন

উখিয়া সংবাদ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম :: বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৯
  • ৫৭

পঞ্চগড়ে এক নারীকে আট বছর ধরে লোহার শেকলে বেঁধে রাখা হয়েছে। ওই নারী মানসিক ভারসাম্যহীন বলে জানিয়েছেন তার পরিবার। তার দুই সন্তান রয়েছে।

স্বামীর নির্যাতনের কারণেই ওই নারী মানসিক ভারসাম্যহীন হয়েছেন বলে তার বাবার বাড়ির লোকজনের অভিযোগ। করসিনা আক্তার নামের ওই নারী সদর উপজেলার সাতমেড়া ইউনিয়নের হড়েয়াপাড়া গ্রামের কলিমউদ্দিনের মেয়ে।

ভুক্তভোগী নারীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ছয় বছর আগে করসিনাকে তার স্বামী তালাক দেন। বর্তমানে তিনি বাবার বাড়িতে শেকল পড়া অবস্থায় রয়েছেন। তার দুই সন্তান রয়েছে স্বামীর বাড়িতে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, করসিনার বাম পায়ে লোহার শেকল পরিয়ে ঘরের খুঁটিতে তালা দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। এর আগে ডান পায়ে শেকল ছিল। সেখানে ক্ষতের সৃষ্টি হলে বাম পায়ে শেকল দেওয়া হয়। এভাবে পা বদলিয়ে দিনের পর তাকে আটকে রাখা হয়। স্বাভাবিকভাবে দেখলে সুস্থই মনে হবে করসিনাকে। কথাও বলেন গুছিয়ে। বাবা-মাসহ নিজের এবং ছেলেমেয়েদের নামও লিখতে পারেন সুন্দর করে। তবে অজ্ঞাত কারণে মাঝে-মধ্যেই মারমুখি হয়ে ওঠেন তিনি। সুযোগ পেলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে দূরে কোথাও চলে যান। কখনো কখনো রেগে যান। সামনে কাউকে পেলে মারধর করেন।

করসিনার পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে সুস্থ ও মেধাবী ছিলেন করসিনা। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় তেঁতুলিয়া উপজেলার মানিকডোবা গ্রামের নাজিম উদ্দিনের ছেলে আবুল হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর শুরুতে কোনো সমস্যা ছিল না। এর মধ্যে একটি ছেলে সন্তান জন্ম দেন করসিনা। এরপর শুরু হয় তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। নির্যাতনের মধ্যে এক যুগের বেশি সময় সংসার করেন তিনি। পরে একটি মেয়ের জন্ম দেন তিনি।

তবে দ্বিতীয় সন্তানের মা হওয়ার পর থেকে অজ্ঞাত কারণে সামান্য রাগারাগি হলে স্বামীর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যেত। এক সময় তাকে পাগল আখ্যা দিয়ে পায়ে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখেন স্বামী আবুল হোসেন। সংসার জীবনের শেষের প্রায় দুই বছর স্বামী তাকে নির্যাতনের পাশাপাশি কখনো বেঁধে রাখেন, কখনো ঘরে আটকিয়ে রাখেন। এরপর তাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে ছেলেমেয়েদের বাড়িতেই রাখেন আবুল হোসেন। বর্তমানে বড় ছেলে হৃদয় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে এবং মেয়ে আশামনির বয়স সাত বছর। পরে সুযোগ বুঝে স্বামী আবুল হোসেন তাকে তালাক দেন এবং তালাকের দুই মাসের মধ্যে তিনি আবার আরেকজনকে বিয়ে করে নতুন সংসার করতে থাকেন।

তালাক প্রাপ্তির পর করসিনার মানসিক সমস্যা আরও বেড়ে যায়। তিনি বাড়িতে থাকতে চান না। স্বামীর বাড়ি যেতে চান। ছেলেমেয়েদের দেখতে যেতে চান। ভালো কোনো খাবার দিলে ছেলেমেয়েদের জন্য তুলে রাখেন। কখনো কখনো অসংলগ্ন আচরণ করেন। সুযোগ পেলে পরিবারের সদস্যদের মারধর শুরু করেন। এরই মধ্যে একাধিকবার বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। করসিনার দিনমুজুর বাবা মেয়ের চিকিসার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালেও চিকিৎসার জন্য দুই মাস রাখা হয়। তবে আর্থিক অনটনে পরিপূর্ণ চিকিৎসা হয়নি তার। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে বাবা-মা তার পায়ে শেকল দিয়ে বাড়িতে আটকিয়ে রাখেন। আট বছর ধরে পায়ে শেকল নিয়ে বাবার বাড়িতে বন্দী জীবন পার করছেন করসিনা।

এখন মাঝে-মধ্যে তাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়। তবুও তিনি ঘুমাতে পারেন না। দিনের আলোতে মানুষজন দেখে ভালো থাকেন করসিনা। তবে রাত গভীর হলে তিনি অস্থির হয়ে উঠেন। উচ্চস্বরে কান্নাকাটি আর চেঁচামেচি করেন। তার কান্নার জন্য পরিবারের সদস্যসহ প্রতিবেশীরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না।

ওই নারীর প্রতিবেশী নুরুজ্জামান বলেন, ‘স্বামীর অবহেলা এবং সন্তানদের ভালোবাসা নেই বলে করসিনার অসুস্থতা দিন দিন বাড়ছে। চিকিৎসার সঙ্গে পারিবারিক সহানুভূতি পেলে তিনি সুস্থ্য হয়ে উঠতে পারে। তার চিকিৎসার জন্য সরকারি-বেসরকারি সহায়তা প্রয়োজন। ভালো চিকিৎসা পেলে তিনি সুস্থ্য হয়ে উঠবেন।’

করসিনার মা আলিমা বেগম বলেন, ‘শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা ছাড়া কোনো উপায় নেই। নিজের মেয়েকে এভাবে রাখতে খুব খারাপ লাগে। কিন্তু কী আর করার আছে। সুযোগ পেলেই সে পালিয়ে যায়। কোথায় চলে যায় কোনা ঠিক নেই। তখন যদি তার অন্যকিছু একটা হয়ে যায়। সেই ভয়ে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।’

করসিনার বাবা কলিম উদ্দিন বলেন, ‘বিয়ের আগে মেয়েটি আমার ভালোই ছিল। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই তার ওপর নানা রকম নির্যাতন শুরু হয়। স্বামীর নির্যাতনের কারণে মেয়ে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। আমরা তার স্বামীকে মেয়ের চিকিৎসার জন্য খরচও দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে কোনো কথা শোনেনি। পাগল বলে আমার মেয়েকে সে তালাক দিয়ে দেয়। এখন টাকার অভাবে আর চিকিৎসা করাতে পারছি না।’

সাতমেরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান জানান, তার চিকিৎসার জন্য ভিজিডি কার্ড দেওয়া হয়। বিষয়টি জেলা প্রশাসককেও জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক চিকিৎসা সহায়তার জন্য একটা ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15