বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৫:২৯ অপরাহ্ন

বুঝাইলে বুঝে”–ওসি মোহাম্মদ আইয়ুব

উখিয়া সংবাদ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম :: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২০
  • ২১০

১১ই জুন‍’ ২০২০ বিকাল ৫ টা। একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিলাম। একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে বার বার কল আসছিলো। রিসিভ করার সুযোগ ছিল না। কয়েকবার আমি মিটিং-এ আছি ম্যাসেজ সেন্ড করলাম। কোন লাভ হলো না। আবার কল। রিসিভ করে সালাম দিয়ে বললাম, ”আমি মিটিং এ আছি”। বেশি জরুরি না হলে আধা ঘন্টা পরে কল দেন। আচ্ছা, ঠিক আছে- বলে ফোন কেটে দেন। আমিও স্বস্তি পেলাম। হয়ত তেমন জরুরি কিছু না।

আধাঘন্টা পর কনফারেন্স শেষ হলো। আমি ঐ নাম্বারে কল ব্যাক করলাম। রিসিভ করেই সালাম দিয়ে তাঁর পরিচয় দিলেন। তিনি ইউনিয়ন পর্যায়ের একজন সম্মানিত জনপ্রতিনিধি।

কুশল বিনিময়ের পর যা বললেন, তাতে কিছুটা অস্বস্তিবোধ করলাম। যা শুনবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। যদিও অনুরুপ ঘটনা দেশের কোথাও যে ঘটেছে না, এমন নয়।

তিনি বললেন, তাঁর এলাকার একজন লোক চট্টগ্রামে চাকরি করতেন। কিছুদিন আগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আজ বিকালে মারা গেছেন। তার আত্মীয় স্বজনদের বলেছিলেন, চট্টগ্রামে দাফন করে ফেলতে। কিন্তু তারা শুনলো না। লাশ নিয়ে রওনা করেছে। কবরস্থানে কবর খুড়ছে। অন্যদিকে আতঙ্কিত লোকজন জড়ো হচ্ছে। লাশ নিয়ে এলাকায় ঢুকতে দেবে না। লাশ দাফনে বাধা দিবে। দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হতে পারে। আপনি কিছু পুলিশ পাঠান।

আমি তাকে বললাম,- এই লোক যে করোনা আক্রান্ত ছিলেন, এটা কি শিউর ?
-হ্যাঁ, শিউর।
কিভাবে শিউর হলেন ? পরীক্ষার রিপোর্ট কী দেখেছেন ?
-না। শুনেছি।
তার মানে নিশ্চিত নন । আমিও চট্টগ্রাম থেকে সরকারিভাবে কোন করোনা রোগীর লাশ প্রেরণের বার্তা বা ই-মেইল পাইনি। সুতরাং আমি তাকে করোনা আক্রান্ত ছিল বলতে পারি না।

আমি পুলিশ পাঠাবো না । কিছু কথা বলছি, মনোযোগ সহকারে শুনুন। তারপর লাশ দাফনে যারা বাধা দিতে জড়ো হচ্ছে, তাদের বুঝাবেন। আশা করি তারা বুঝবেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেল্থ বুলেটিন থেকে আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি করোনা কিভাবে ছড়ায়-
• আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি ও কাশি থেকে।
• আক্রান্ত ব্যক্তির কথা বলা থেকে।
• আক্রান্ত ব্যক্তি যেখানে সেখানে থুতু ফেললে।
• আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে হ্যান্ডশেক করলে।
• আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে কোলাকুলি করলে।
• আক্রান্ত ব্যক্তি লোকালয়ে ঘোরাঘুরি করলে।
ঠিক কি না ?
-ঠিক।
এবার আমাকে বলুন-
ঐ লাশ কি কথা বলে ?
-না।
হাঁচি দেয়?
-না।
কাশি দেয় ?
-না।
হ্যান্ডশেক করে ?
-না।
কোলাকুলি করে ?
-না।
যেখানে সেখানে থুতু ফেলে ?
-না।
লোকালয়ে ঘোরাঘুরি করে ?
-না।
তাহলে তার কাছ থেকে করোনা ছড়াবে কি করে ?
করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির চেয়ে করোনা আক্রান্ত জীবিত ব্যক্তি হাজার গুন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আমার জানা মতে, এই পর্যন্ত একটিও প্রমানিত ঘটনা নেই যে, করোনায় মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে কেউ করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিধি গুলো মেনে মৃতের গোসল দিলে, জানাযা পড়লে, সৎকার করলে করোনা ছড়ানোর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুসারে সঠিক সৎকার পাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। এই অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না।
একটু ভেবে দেখুন। একজন মানুষের অন্তিম বিদায়ে, শেষ যাত্রায় ও দাফনে বাধা। কতই না মর্মস্পর্শী, হৃদয় বিদারক ও মর্মান্তিক !

ঐ লোকটির বাড়ি আপনার এলাকায়। চাকরি করতেন চট্টগ্রামে, তাইতো ?
-হ্যাঁ।

আচ্ছা, আমার বাড়ি তো কক্সবাজার, চাকরি করি আপনাদের এলাকায়। প্রতিদিন আপনাদের এলাকায় করোনা আক্রান্ত কোন না কোন রোগীর বাড়িতে যাচ্ছি। করোনায় মৃত্যু বরণ করা ব্যক্তির জানাযায় যাচ্ছি। লাশ দাফনে যাচ্ছি। করোনা রোগীর স্যাম্পল কালেকশনে স্বাস্থ্য কর্মীকে সহায়তা করতে যাচ্ছি। করোনা রোগীকে আইসোলেশনে থাকা নিশ্চিত করতে যাচ্ছি। করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইন করতে যাচ্ছি। আবার কোয়ারেন্টাইনে থাকাদের ফোন পাওয়া মাত্রই সরকারী খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিতে যাচ্ছি। করোনা রোগীর বাড়ি লকডাউন করতে যাচ্ছি। লকডাউনে থাকা করোনা সনাক্ত রোগীদের পর্যবেক্ষণ করতে যাচ্ছি। অন্য এলাকা থেকে ও হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসা করোনা রোগীকে আটক করে পুনরায় হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি অথবা আইসোলেশনে রাখছি। আরো কত কি ! অর্থাৎ প্রতিদিনই করোনা আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসছি।

ধরুন, আগামীকাল করোনা আক্রান্ত হয়ে আমি মৃত্যুবরণ করলাম। তাহলে আমার লাশটা কি কক্সবাজার আমার বাড়িতে পাঠাতে দিবেন না ? যে বাবা-মা মাথার ঘাম পায়ে, ফেলে, লালন-পালন করে, পড়া-লেখা শিখিয়ে, আপনাদের সেবা করার উপযুক্ত করে পাঠালেন, তাদের প্রিয় সন্তানের অন্তিম শয্যার চেহারা শেষ বারের মতো দেখতে দিবেন না ? আমার জনম দুখিনী মা, যে আমার আসার প্রহর গুনে পথ পানে চেয়ে থাকে, সে মাকে হৃদয় ভাঙ্গা করুন আর্তনাদের সুরে, ’আমার পুত আসছে নাকি’ বলার সুযোগ দিবেন না ? আমার বোনদের ভাই হারানোর জমাট ব্যাথা বিলাপ করে বুক হালকা করতে দিবেন না ? ”আমার ভাই চাকরির কারণে দীর্ঘদিন এলাকার বাইরে ছিল। কেউ কোন দেনা পাওনা থাকলে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন। আমি মিটিয়ে দিব। আমার ভাইকে সবাই মাফ করে দিবেন”- জানাযার আগে আমার ছোট ভাইকে এই কথাটা বলার সুযোগ দিবেন না ?
-প্লিজ, আর বলবেন না, স্যার। আসলে আমরা এভাবে কখনো ভেবে দেখিনি। আমি এখনি সবাইকে আপনার কথা গুলো শুনিয়ে দিচ্ছি। লাশ দাফনে কাউকে বাধা দিতে দিব না। স্বাস্থ্য বিধি মেনে আমি নিজেও জানাযায় অংশ নিব।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার।
-আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।
পরের দিন একজন প্রফেসর সাহেবের মাধ্যমে খবর নিলাম। ঐ লোকের লাশ এলাকায় আনতে এবং দাফন-কাফনে কোন সমস্যা হয়নি। আশা করি আজ থেকে করোনা আক্রান্ত মৃত দেহ দাফনে কেউ বাধা দিবেন না। কারো অধিকার হরণ করবেন না। স্বাস্থ্য বিধি মেনে লাশ সৎকারে সহায়তা করে নিজ নিজ ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব পালন করবেন।

লেখক-

মোহাম্মদ আইয়ুব

অফিসার ইনচার্জ
লালমাই থানা, কুমিল্লা।
তাং-১৩/০৬/২০২০ খ্রিঃ।

ফেইসবুক আইডি থেকে নেওয়া 

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15