বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২০, ০৮:৪৪ পূর্বাহ্ন

সংবাদ, সাংবাদিক/সাংবাদিকতা, অপ-সাংবাদিকতা ও কিছু কথা

এম আর আয়াজ রবি ::
  • আপডেট টাইম :: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২০
  • ১৭

‘News’ বা ‘সংবাদ’ এমন একটি শব্দ, যেটা সবসময় বহুবচন অর্থে প্রকাশ পায়। এজন্য সংবাদ বিশ্লেষকরা ‘News always be new’ বলে অভিহিত করেছেন। ‘News’ বা ‘সংবাদ’ যাই বলা হয়ে থাক না কেন, ‘সংবাদ’ হলো চলতি ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ ও প্রকাশ, যে বিষয়ে পাঠকের চিন্তন, আগ্রহ, মনোভাব ও আকাঙ্ক্ষা উদ্দীপিত করে। এ কথাটাকে অন্যভাবে বললে বলা যায়-যে ঘটনা বা ঘটনাপুঞ্জ, যেটা/যেগুলো যেকোন মাধ্যমে (ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া বা পোর্টাল/ভাচ্যুয়াল মিডিয়া) প্রকাশিত হলে, ব্যক্তি বা সমাজে যে বিভিন্ন ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং সেসব ঘটনা বা ঘটনাবলীর প্রতিবেদন অবশ্যই সত্য, নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ, গুরুত্বপূর্ণ এবং মানুষের মনে কৌতুহল, উদ্দীপনা, আগ্রহ জন্মায় অথবা ঘটনাগুলো থেকে ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্ম লাভ করে,তাকে খবর বা সংবাদ বলে। প্রতিদিন ঘটে যাওয়া ঘটনাই শুধু সংবাদ নয়। আমাদের চর্তুপার্শ্বে বিদ্যমান যে কোন সমস্যাও হতে পারে এক একটি সংবাদ।

বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সংবাদকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। যেমন, সংবাদ বিশেষজ্ঞ হ্যারিস ও জিনসন বলেন, ‘সংবাদ হচ্ছে একটি ঘটনা, বিষয় বা মতামতের বিবরণ যা জনগণ আগ্রহ নিয়ে পড়ে।’ আবার নিউ ইয়র্ক সান পত্রিকার সম্পাদক চার্লস এ. ডানার মতে, ‘মানুষকে যা বিস্মিত ও অবাক করে তাই সংবাদ।’ তিনি তার এ সংজ্ঞাটির আরও উৎকর্ষ করে বলেন, ‘ইতিপূর্বে মনোযোগ আকৃষ্ট হয়নি অথচ সমাজে বৃহত্তর অংশকে কৌতূহলী করে তোলে, এমন যে কোনো বিষয়ই ‘সংবাদ’।

সাধারণভাবে যিনি সংবাদপত্র বা বিভিন্ন মাধ্যমের জন্য সংবাদ সংগ্রহ করেন, সত্যমিথ্যা যাচাই বাছাই করেন, লিখেন, প্রকাশ করেন তাকেই সাংবাদিক বলে অভিহিত করা হয়। তবে বর্তমান সময়ের আধুনিক সাংবাদিকতার বিশাল পরিসরে সাংবাদিককে নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞায় বেঁধে দেওয়া কষ্টসাধ্য বিষয়। এখন সংবাদপত্রের ধরনে যেমন পরিবর্তন এসেছে, তেমনি সাংবাদিকদের কাজের পরিধিতেও এসেছে পরিবর্তন । সাংবাদিকরা জাতির বিবেক। ‘শতভাগ সঠিক সংবাদ প্রচারের কোনো বিকল্প নেই। মানুষ ঘটনার সঠিক সংবাদ জানতে চায়। সত্য লুকানোর মধ্যে ঘটনার প্রতিকার হয় না। সঠিক ও সৎ সাংবাদিকতা সমাজ বদলে দিতে পারে’।

সংবাদদাতা বা সাংবাদিক (ইংরেজি: Journalist) বিভিন্ন স্থান, ক্ষেত্র, বিষয় ইত্যাদিকে ঘিরে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংবাদ সংগ্রহসহ বিভিন্ন ধরণের তথ্য সংগ্রহপূর্বক সংবাদ কিংবা প্রতিবেদন রচনা করে সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রেরণ করে থাকেন, এটাই সাংবাদিক বা সংবাদদাতার কর্ম।

একজন প্রতিবেদক তৃণমূল পর্যায় থেকে তথ্যের উৎসমূল অনুসন্ধান করেন, প্রয়োজনে সাক্ষাৎকার পর্ব গ্রহণ করেন, গবেষণায় সংশ্লিষ্ট থাকেন এবং অবশেষে প্রতিবেদন প্রণয়নে অগ্রসর হন। তথ্যের একীকরণ সাংবাদিকের কাজেরই অংশ, যা কখনো কখনো রিপোর্টিং বা প্রতিবেদন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।

সততা ও পেশাদারিত্ব একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় গুণ ও ভিত্তি। অনেক যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকলেও সততা ও পেশাদারিত্বের অভাবে অর্জিত সম্মান ধুলোয় মিশে যেতে পারে। যেহেতু গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ বলা হয়, তাই গণমাধ্যমকর্মীদেরও দর্পণের মতো স্বচ্ছ হতে হয়। এটা যেমন তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশবিশেষ, তেমনি সাংবাদিকতার বিশেষ ভূষণও বটে।

যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ব্যাপক অনুসন্ধানের পর উপলব্ধি করেন, মিডিয়ার রীতিসিদ্ধ সীমানায় প্রযুক্তি আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চলমান প্রভাব বজায় থাকলে ‘সাংবাদিকতা’ ধারণাটির একটি স্থির সংজ্ঞা অবশ্যই লাগবে। কিন্তু সাংবাদিকতার স্থায়ী বা সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নেই।
ইংরেজি ‘Journal’ ও ‘Ism’ শব্দের মিলনে ‘Journalism’ শব্দটি তৈরি। ‘Journal’ হচ্ছে কোনো কিছু প্রকাশ করা আর ‘Ism’ মানে অভ্যাস করা, অনুশীলন বা চর্চা করা। সুতরাং বলা যেতে পারে, সমাজে বিদ্যমান সামঞ্জ্যতা, অসামাঞ্জ্যতা, অভাব, অভিযোগ, আনন্দ, খুশী, সফলতা বা ব্যর্থতার ঘটনা বা দূর্ঘটনার প্রকাশ করার জন্য যে চর্চা বা অনুশীলন করা হয়, তা-ই সাংবাদিকতা বা জার্নালিজম। সাদামাটা ও সংকীর্ণ ভাষায়, যিনি সংবাদপত্র বা ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার জন্য সংবাদ সংগ্রহ করেন, যাচাই-বাছাই করেন এবং বস্তুনিষ্ট ও নিরপেক্ষভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করেন, তাইই সাংবাদিকতা। তবে আধুনিক সাংবাদিকতার বিশাল আঙ্গিনায় সাংবাদিকতাকে কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় বেঁধে দেওয়া যায় না।

প্রেস কাউন্সিল এ্যাক্ট-এ সাংবাদিকতার একটা সংজ্ঞা দেয়া আছে। এতে বলা হয়েছে : “ Working journalist means the activity or profession of writing for newspapers, magazines, or news websites or preparing news to be broadcast by a person who is employed as such in, or in relation to, any newspaper establishment and includes an editor, a leader writer, news editor, sub-editor, feature writer, reporter, correspondent, copy tester, cartoonist, news photography, calligraphist and proof reader. “

উপরোক্ত সংজ্ঞা থেকে স্পষ্টতঃ প্রতীয়মান হয় যে, সংবাদপত্র অফিসে কর্মরত সম্পাদক, উপ-সম্পাদকীয় লেখক, বার্তা সম্পাদক, সহ-সম্পাদক, ফিচার সম্পাদক, প্রতিবেদক, প্রতিনিধি, লিপিবদ্ধকার, কার্টুনিস্ট, আলোকচিত্রী ও প্রুফ রিডার-সকলেই সাংবাদিক। এঁরা খবরের সন্ধান করেন, খবরের পেছনে ছোটেন, খবর নির্বাচন করেন, সম্পাদনা করেন, সংশোধন করেন। সাংবাদিকরা যা করেন, তা হচ্ছে সাংবাদিকতা। অন্যদিকে সাংবাদিকতা হচ্ছে কাজ। এঁদের কাজ হচ্ছে তথ্য সংগ্রহ করা, প্রতিবেদন লেখা এবং সম্পাদনা করা।

সাংবাদিকতা হল বিভিন্ন ঘটনাবলী, বিষয়, ধারণা, ও মানুষ সম্পর্কিত প্রতিবেদন তৈরি ও পরিবেশন, যা উক্ত দিনের প্রধান সংবাদ এবং তা সমাজে প্রভাব বিস্তার করে। এই পেশায় শব্দটি দিয়ে তথ্য সংগ্রহের কৌশল ও সাহিত্যিক উপায় অবলম্বনকে বোঝায়। মুদ্রিত, টেলিভিশন, বেতার, ইন্টারনেট, এবং পূর্বে ব্যবহৃত নিউজরিল সংবাদ মাধ্যমের অন্তর্গত।

সংবাদিকতা একটি কঠিন ও মহান পেশা। এ পেশাকে মানুষ অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখে। এ পেশার লোকজনকে অনেকেই জাতির বিবেক বলে থাকেন। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকতার সাবলীল মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। শুধু দেশ, জাতি নয়, বিশ্ব উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও সাংবাদিকদের অগ্রণী ভূমিকা দেশে দেশে স্বীকৃত। সাধারণ জনগণের এ মহান পেশার প্রতি প্রগাঢ় আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। কারণ এ সমাজের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরবারির ন্যায় কলমের শানিত অস্ত্র একমাত্র সাংবাদিকরাই ধরে থাকেন। বিভিন্ন ধরনের ঘটনা প্রবাহের সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি পত্রিকার মাধ্যমে দেশের বর্তমান অবস্থা ও করণীয় বিষয়ও অহরহ দিক-নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। তাই তো প্রকৃত সাংবাদিকের কোন দেশ কাল পাত্র নেই। তারা জগৎ সভার এক একজন পরীক্ষক ও নিরীক্ষক। সামাজিক অনাচার ও বৈপরিত্যের বিরুদ্ধে সাংবাদিকতা একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা, মবানবতার অতন্দ্র প্রহরী সাংবাদিকরা দেশ ও জাতির শেষ ভরসা। তাদের তৃতীয় নয়ন সব সময় সত্য উদ্ঘাটন ও নিরপক্ষতার চোখ হয়ে ঘটনার গভীরে গিয়ে বাস্তবসত্য উন্মোচনে পারঙ্গম হবে, এটাই পাঠক ও দর্শক সমাজ আশা করেন।
সৎ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিকরা বিদ্যমান শত চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করেই তাদের পেশার সম্মানকে অমলিন রেখেছেন। এ পেশা মূলতঃ শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, দেশ-জাতি এবং মানুষ ও মানবতার কল্যাণে সেবার মাধ্যমও বটে। তাই এই মহান পেশার সেবকদের ওপর যখন জুলুম ও নির্যাতন নেমে আসে তখন আমরা ব্যথিত হই। তবে আমরা এর চাইতে বেশি ব্যথিত ও মর্মাহত হই তখনই, যখন দেখি কোন সাংবাদিক ভাই ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিবেচনায়, অহংকার কিংবা প্রলোভনের কারণে সাংবাদিকতার নীতিমালা এবং কর্তব্যবোধ বিসর্জন দিয়ে বা পেশাগত নীতি, নৈতিকতা জলাঞ্জলী দিয়ে বিভিন্ন স্খলনের শিকার হন !

সাংবাদিকতা যতোটা না পেশা তার চেয়ে অনেক বেশি নেশা, ভালোলাগা। এই নেশাটা হচ্ছে দেশ ও মানুষের জন্য কিছু করার নেশা। আমার মনে হয়, একজন চিকিৎসক যেভাবে মানুষের সেবা করতে পারেন তার চেয়ে অনেক বেশি সেবা করতে পারেন একজন সাংবাদিক। কোন সাংবাদিকের এই নেশা কেটে গেলে তিনি তখন যতোটা না সাংবাদিক থাকেন তার চেয়ে বেশি চাকুরিজীবী!

সাংবাদিকতার এ মহান পেশা ক্রমান্বয়ে কলুষিত হয়ে আসছে-সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সাংবাদিকের স্বাধীনতার নামে এক ধরনের অপসাংবাদিকতার প্রয়োগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঠিক যেন ‘চেরাগের নিচে অন্ধকার’। বিভিন্ন লেজুড়ভিত্তিক রাজনৈতিক দলের কর্মী, অর্থলোভী, স্বার্থান্বেষী, টাউট-বাটপার, প্রতারক, নেশাখোর,চাঁদাবাজ, তথ্য গোপনকারী, বদমায়েশ টাইপের লোক, নারীলোভী, মাদক পাচারকারী, ঠগ, ধান্ধাবাজ, সন্ত্রাসীসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত ব্যক্তিরা এখন সাংবাদিকতার কার্ড ঝুলিয়ে যথেষ্ট বিচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে এ মননশীল কর্মচর্চায়। তারা জেনে শুনেই ব্যাখ্যার স্থলে অপব্যাখ্যা, ন্যায়কে অন্যায়ের রূপ দান, সত্যকে ঢাকার জন্য অসত্যের আবরণ দেওয়াকে মনে করেন সাংবাদিকতার বিজ্ঞতা!

অনেকক্ষেত্রেই চোখে পড়ে, সংবাদ লেখার যোগ্যতা নেই অথচ সাংবাদিক। সম্পাদনা করার মেধা নেই অথচ সম্পাদক। দু’লাইন / দু’কলম শুদ্ধ বাংলা বলতে ও লিখতে পারেনা অথচ তারা রিপোর্টার! যে জানেনা কোনটা সংবাদ, কোনটা সংবাদ না, বা একটা প্রতিবেদন কিভাবে লিখতে হয় তার কোন জ্ঞান নেই সে হয়ে যায় মস্তবড় প্রতিবেদক, কলামিষ্ট ও লেখক ! এ হচ্ছে সংবাদপত্র জগতের একটি ভয়ংকর চিত্র। এগুলো থেকে অপসাংবাদিকতা বিস্তার লাভ করেছে চারদিকে। আর এই অপসাংবাদিকতার বিকৃত আরেকটি প্রচলিত শব্দ হচ্ছে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’।

‘হলুদ সাংবাদিকতা’ কোন সাংবাদিকতা নয়, সেটাকে কোনভাবেই সাংবাদিকতার আবরনে রুপ লাভ দেওয়াও যায় না। তাই হলুদ সাংবাদিকতা একটি বিকৃত ও অপ-সাংবাদিকতার নেতিবাচক দিক মাত্র। হলুদ সাংবাদিকতার জন্য দায়ী মূলতঃ এক শ্রেণীর সাংবাদিক ও সংবাদপত্র এবং কিছু ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার মালিক ও সম্পাদকবৃন্দ। এর সাথেই রয়েছে দেশ ও সমাজের সার্বিক অবক্ষয়ের বাস্তব চিত্র । এদের কারণেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাংবাদিক মাত্রই সাধারণ মানুষের কাছে পরিণত হয়েছে এক ভীতিকর প্রাণীতে। মানুষ সাংবাদিক দেখলেই ‘সাংঘাতিক’ বলে আঁৎকে উঠে। কারণ হচ্ছে লেখার স্বাধীনতার সুবাদে এরা ন্যূনতম বিধি-বিধান আর নীতি-জ্ঞানকে তোয়াক্কা না করে ‘রাতকে দিন’ আর ‘দিনকে রাত করে’ সংবাদ পরিবেশন করেন। বিবেকের কাছে প্রশ্ন জাগে এটি আবার কেমন সাংবাদিকতা? সত্যকে গোপন করে মিথ্যাকে ফুলিয়ে রং লাগিয়ে প্রচার করাটা সাংবাদিকতার কোন স্তরে পড়ে ? সংবাদ পরিবেশনায় এক চোখা/বায়াসড আর তিলকে তাল বানানোর উদ্ধতা, অবশ্যই সচেতন পাঠক সমাজ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে এটা স্বাভাবিক ।

অনেক সময় সাংবাদিকতার লেবাস পরে অনেকে কত যে নীচতা, হীনতা, দীনতা আর সংকীর্ণতায় আকন্ঠ নিমজ্জিত থাকেন, তা বলতেও লজ্জা হয়। একজন সাংবাদিক যদি এটা ভাবেন আমি সাংবাদিক, আমার হাতে কলম আছে, কাগজ আছে, তাই যা খুশি লিখবো! সবার মাথা আমি সাংবাদিক কিনে নিয়েছি এমন ভাবা কোনভাবেই উচিত নয়। লেখার স্বাধীনতা মানে অন্যের অধিকার, সামাজিক অবস্থান, মান-সম্মানকে উপেক্ষা করা নয়। সংবাদপত্রের যেই স্বাধীনতা মানুষের সকল স্বার্থের পাহারাদার, তার সকল অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানকারী এবং অসহায়ের শেষ কন্ঠ, সেই পবিত্র স্বাধীনতাকে আজ ‘ভেড়ায় ক্ষেত খাওয়ার’ মতো মর্মান্তিক ভূমিকার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কিংবা অন্য কোন উদ্দেশ্যে ব্যক্তি, গোষ্ঠি বা রাজনৈতিক দলের ওপর অসত্য তথ্য আরোপ করা হচ্ছে। ফলে অনেকে সামাজিক, রাজনৈতিক বা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে, যেসব অভিযোগ বিভিন্ন গন মাধ্যমে উত্থাপন করা হচ্ছে তা সংবাদপত্রগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণ করতে পারছে না।

অনেকে বলছেন, অনেক স্বার্থান্বেষী সাংবাদিকবৃন্দ কিংবা সংবাদপত্রের মালিকরা সংবাদপত্রের যে স্বাধীনতা রয়েছে, সে সুযোগের অপব্যবহার করছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশের সংবাদপত্র সম্পর্কে, মানুষেরে বিশ্বাস ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে উঠছে। যে সব সাংবাদপত্র এ ধরনের মিথ্যা, বানোয়াট কিংবা উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ পরিবেশন করে তারা প্রচলিত আইন-কানুন, সংবিধান এক কথায় সমগ্র দেশ ও জাতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছেন।এই ধরনের সাংবাদিকদের রাজনৈতিক স্বার্থান্ধতা ও অনৈতিক কার্যকলাপের কারণে সাংবাদিকতার মত এ মহান পেশাও আজ প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে।

তবে বর্তমানে সরকার ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ করে অপ-সাংবাদিকতা রোধ করার চেষ্টা করছেন কিন্তু অপসাংবাদিকতা রোধ করতে গিয়ে মুক্ত সংবাদ প্রকাশ, সাংবাদিকতাসহ মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে শৃংখলিত করার চেষ্টা করছেন বলে সমাজের অনেক গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিবর্গ মত প্রকাশ করেছেন। অবশ্য অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কাদের স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে? এতে কারা লাভবান হবে? আর এই সময়ে এই আইনের ব্যবহার কেন বাড়ছে? জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও আইনের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘আমরা উদ্বেগের সাথে এই সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার বাড়ার বিষয়টি লক্ষ্য করছি ৷ আর তা বেশি ব্যবহার হচ্ছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এটা আসলে আমাদের আতঙ্কিত করে৷”। আজকের লেখার মুল উদ্দেশ্য কিন্তু ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ নয়। তাই সম্মানীত পাঠকবৃন্দের উদ্দ্যেশ্যে বলতে চাই, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ বিষয়ে অন্য কোন পর্ব লেখা যায় কিনা মাথায় থাকল।

সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে সংবাদ ও সাংবাদিকতায় অনেক নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এসব চ্যালেঞ্জ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও সমাধান সূত্র চিহ্নিত করে ঐক্যবদ্ধ সমাধান প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে সবার আগে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এরপর সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করে সমাধানের অগ্রাধিকার তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। প্রথমে সর্বাধিক জরুরী চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে এরপর ধীরে ধীরে অন্য চালেঞ্জ/সমস্যার দিকে নজর দিতে হবে।

অনেক অনুমোদনবিহীন যত্রতত্র মিডিয়া গড়ে উঠেছে। এসব মিডিয়াকে নিয়মের আওতায় নিয়ে আসার ব্যাপারে উদ্দ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বা যদি বন্ধ করার প্রয়োজনও পড়ে, তবে বন্ধ করার সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা, কর্মরত সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সাংবাদিকতা পেশার আর্থিক নিরাপত্তা তৈরীর উপায় খুঁজে বের করা সবচেয়ে জরুরী। একই সাথে অযোগ্য, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা এবং নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত খারাপ লোকদের এই পেশায় নতুনভাবে অন্তর্ভুক্তি রোধ করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ইন্টারনেট/অনলাইনের অপপ্রয়োগ রুখতে গণমাধ্যমকর্মীদেরও এ ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সার্বিক বিষয়ে সাংবাদিকদের সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবার ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই। ধন্যবাদ সবাইকে।

এম আর আয়াজ রবি

(লেখক, কলামিষ্ট ও মানবাধিকারকর্মী)
তারিখঃ ৪-জুলাই-২০২০।
Mail: ayaz.robi@gmail.com.

তথ্যসুত্রঃ
০১। বিভিন্ন দৈনিক পত্রপত্রিকাসমুহের অংশবিশেষঃ

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15