বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২০, ০৯:৪২ অপরাহ্ন

’আমি যখন শিক্ষক ছিলাম’’ -মোহাম্মদ আইয়ুব

মোহাম্মদ আইয়ুব ::
  • আপডেট টাইম :: বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২০

(৬ষ্ঠ অংশ)
 
সহযাত্রী সহ হুড়মুড় করে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। সবাই মিলে আলগি দিয়ে গাড়ির নিচে চাপা পড়া দুইজনকে বের করলাম। মাথা থেঁতলে গেছে। মুখমন্ডল রক্তাক্ত ও বিকৃত। পালস্ চেক করে দেখি, মারা গেছে। একজন মাছ বেপারী, অন্যজন কৃষক। আমাদের গাড়ির কয়েকজন যাত্রী তাদেরকে সনাক্ত করতে পেরেছে।

দূর্ঘটনা কবলিত গাড়ির আহত যাত্রীদের আমাদের গাড়িতে উঠিয়ে দিলাম। সাথে আমাদের গাড়ির কয়েকজন বয়স্ক যাত্রী ও মাছের ঝুড়ির বাহকদেরও উঠানো হলো। আমি, মাশুকসহ আরো চারজন যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকলাম। চালক ও হেলপারকে বললাম-হোয়াইক্যং পৌঁছে যেন পুলিশকে সংবাদ দেয়। দু’টো লাশ এভাবে ফেলে রেখে আমরা স্থান ত্যাগ করতে পারি না। অপর চারজন সিদ্ধান্ত নিয়েছে শামলাপুর ফিরে যাবে। আমি আর মাশুক অনুরোধ করলাম পুলিশ না আসা পর্যন্ত যেন আমাদের সঙ্গ দেন। তারাও আমাদের সাথে অবস্থান নিলেন।

আধা ঘন্টার মধ্যে পুলিশ এল। তারা আগেই সংবাদ পেয়েছে। পুলিশ লাশ আর দূর্ঘটনা কবলিত চান্দের গাড়ি হেফাজতে নিল। আমি আর মাশুক হোয়াইক্যং অভিমুখে অপর চারজন বিপরীত দিকে তথা শামলাপুরভিমুখে লম্বা কদমে রওয়ানা করলাম। রাস্তার দুই ধারে উঁচু পাহাড়। পাহাড়ে গভীর অরণ্য । বর্ষণমুখর দিন শেষে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। দিনের আলো ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। এমনিতে আকাশ মেঘলা, উপরন্তু নেমে আসছে ঘন অন্ধকার। পাহাড়ের ঘন জঙ্গল আর লম্বা লম্বা গাছ-গাছালি নিরবে দাঁড়িয়ে আছে। হয়ত নিম্নচাপের প্রভাবে সারা দিনের মুষলধারে বৃষ্টি আর প্রবাহিত ঝড়ো হাওয়ার ধাক্কা সামলিয়ে এখন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। এই গিরিরাস্তার নাম হোয়াইক্যং ঢালা। হয়ত গহিন অরণ্য ভেদ করে তৈরী রাস্তা বলেই এই নাম। বনের গহিনে আস্তানা গেঁড়ে রাজত্ব করে ডাকাত দল। এই রাস্তা দিয়ে চলাচলকারীদের নির্ধারিত হিস্যা দিয়েই চলাচল করতে হয়। তবে আমাদের ভয় নেই। প্রচার আছে, শিক্ষকদের তারা যথেষ্ট ইজ্জত করে। বিনা হিস্যায় শিক্ষকরা যাতায়াত করতে পারে। ডাকাতের ভয় না থাকলেও শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যানী হওয়ায়, হিংস্র বন্যপ্রাণীর আক্রমণের শিকারে পরিণত হতে পারি যেকোনো মূহুর্তে।

হাঁটতে হাঁটতে মাশুক বলল, হেডমাস্টার শরিফ আহম্মদ সাহেব বলেছিলেন, একদিন সন্ধ্যায় তিনি এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বিশালাকৃতির দুইটি হিংস্র বন্যহাতির কবলে পড়েছিলেন। কিছু বুঝে উঠার আগেই  শুড়ে প্যাঁচিয়ে শূন্যে উঠিয়ে ফেলেছিল। আকস্মিক শূন্য থেকে শুড়চ্যুত হয়ে জঙ্গলের মধ্যে হস্তিদৃষ্টির অন্তরালে পড়লেন। খানিকক্ষণপর হাতি দুইটি ডাক ছেড়ে চলে গেল। কোমরে প্রচন্ড আঘাত পেয়েছিলেন। এখনো কোমরে শূলানি অনুভব করেন (আমৃত্যু তিনি এই ব্যথার যন্ত্রনা ভোগ করে গেছেন)। এখন যদি আমরা ডাকাতের কিংবা বন্য হাতির কবলে পড়ি কী হবে?
আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম-ভয় নাই। কিচ্ছু হবে না।

আরো  অল্পক্ষণ হাঁটার পর মাশুক আবার বলল-একটা বিষয় খেয়াল করেছিস?
আমি বললাম-কোন বিষয়?
মাশুক : নুরুল কবির স্যার যদি আমাদের চা খাওয়ার জন্য জোরাজুরি করে ৪০/৪৫ মিনিট আটকে না রাখতেন, তবে ঐ গাড়িতে আমরাও থাকতাম। আমাদের অবস্থাও ঐ দুই লাশের মতো হতে পারতো। অথবা চিরদিনের মতো পঙ্গু হতাম!

আমি : জগদিশ্বরের লিলাখেলা পণ্ডিতেও বুঝে না। আমি কী মতে এর ফায়সালা দিব, বন্ধু?
পরমকরুণাময় যদি কাউকে রক্ষা করতে চায়, মাস্টার নুরুল কবিরের উছিলায় হোক কিংবা তোমার প্যান্ট ছিঁড়ার অযুহাতেই হোক রক্ষা করবেই। তোর মুখে ডাকাতের কথা শুনে একটা গল্প মনে পড়ল।
মাশুক : কি গল্প ?

আমি : শোন্। বিংশ শতাব্দীর শেষ দশক। আমরা তখন হাই স্কুলে পড়ি। আমাদের দুই অগ্রজ মাস্টার হারুন আর মাস্টার হাবিব শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত হয়ে ১ম জন ছেপটখালী, পরের জন মনখালী সরকারি প্রাইমারি স্কুলে যোগদান করেছিলেন। একদিন তারা শামলাপুর গাড়ি না পেয়ে এই ঢালা দিয়ে পদব্রজে হোয়াইক্যং যাচ্ছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা নেমে আসল। হঠাৎ কবলে পড়ল ডাকাত দলের।

মাশুক : তারপর !

আমি : মুখোশ পড়া দু’ডাকাত সামনে এসে লম্বা কিরিচ দা আর চাপাতি ঠেকিয়ে হাত উঁচু করতে বলল। ডাকাতের টর্চ লাইটের আলোতে হাত উঁচু করে কাঁপা কাঁপা গলায় শিক্ষকদ্বয় বললেন, আমরা শিক্ষক, আমাদের কাছে তেমন কিছু নেই। টর্চ লাইটের আলোতে ডাকাতদ্বয় তাদের ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করল। চাপাতি হাতে ধরা ডাকাত ডাক দিয়ে বলল- ওস্তাদ একজন তো ঐডা।
ওস্তাদ বলল, তাই না কি?
-হ অ। আরেকডা হুজুর টাইপের। পাঞ্জাবি-পায়জামা পড়া।
হুজুরটারে দেখ্।
-জ্বি, ওস্তাদ।
এবার ডাকাতরা মাস্টার হাবিব কে বলল, কোন আওয়াজ করবি না। এখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক।
মাস্টার হাবিব সুবোধ বালকের মতো দাঁড়িয়ে থাকল। মাস্টার হারুনকে জঙ্গলের আড়ালে নিল। পাঞ্জাবি-পায়জামার পকেট চেক করে ২৭ টাকা পেল। তারপর পাঞ্জাবি-পায়জামা, সেন্ডোগেঞ্জি সহ আন্ডারওয়্যার খুলে নিল।
-ওস্তাদ কাম শেষ।
-ঐডারে ১০ টাকা দিয়ে বিদায় কর্।
ওস্তাদের হুকুম তাৎক্ষণিক তামিল হলো। মাস্টার হাবিবের পকেটে ১০ টাকা গুঁজে দিয়ে বলল, সোজা চলে যা ডানে-বামে, সামনে-পিছনে তাকাবি না।
মাস্টার হারুনকে বিবস্ত্র করে সমস্ত কাপড়-চোপড় খুলে নিয়ে গেলেও মারধর করে নাই। কারণ, মাস্টারদের একটা আলাদা ইজ্জত আছে !
ডাকাত দল থেকে মুক্তি পেয়ে প্রথমে হাবিব সাহেবের শার্ট দিয়ে সতর ঢেকে কিয়দ্দূর অতিক্রম করে, এক বাড়ি থেকে লুঙ্গি ও শার্ট ধার নিয়ে তারা উখিয়া গিয়েছিলেন।

তিনদিন পর একই রাস্তায় স্কুলে যাওয়ার পথে ঘটনাস্থলের জঙ্গলে হারুন সাহেবের আন্ডারওয়্যারটি পাওয়া গিয়েছিল।

মাশুক : আচ্ছা-মাস্টার হাবিবকে চেকও করল না। আবার তার পকেটে উল্টো ১০ টাকা গুঁজে দিল। কারণ কি?
আমি : সেটি জানার কৌতূহল আমারও ছিল। কিন্তু সমাধান পাই নাই। এই ঘটনা যারা শুনেছে তারাই মাস্টার হাবিবকে সন্দেহ করতো। কিন্তু কেউ রহস্য উন্মোচন করতে পারে নাই।

মাশুক: সন্দেহতো করারই কথা। হারুন সাহেবের সব কিছু লুটে নিলো, আর তাকে কিছুই করল না ! আমার মনে হয়, ডাকাতরা হাবিব সাহেবের পূর্ব পরিচিত ছিল। তবে আমি শুনেছি, একদিন মাস্টার হাবিব, হারুন আর আজিজ উল্লাহ সাহেবের মনখালী খাল সাঁতার কেটে পার হাওয়ার বিড়ম্বনার কথা। হারুন সাহেব এক হাতে পায়জামা-পাঞ্জাবি উপর করে ধরে অন্য হাতে সাঁতার কেটে পার হওয়ার সময় প্রবল স্রোত তার পরনের আন্ডারওয়্যারটি ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তিনদিন পর সমুদ্রের চরে সেটি পাওয়া যায়।

আমি : এই গল্প আমিও শুনেছি। এখানে শিক্ষকের আন্ডারপ্যান্ট ডাকাত নিলেও তিনদিন পর পাওয়া যায়, স্রোতের টানে ভেসে গেলেও তিনদিন পর পাওয়া যায়। অনেকটা সাধারণ বর্তমান কালের উদাহরণের মতো-
-সূর্য পূর্বদিক থেকে উদিত হয়- চিরন্তন সত্য (Universal Truth).

-মা প্রত্যেহ ভোরে কোরআন তেলাওয়াত করেন- অভ্যাসগত সত্য (Habitual Fact).

-শের শাহ ঘোড়ার ডাকের প্রচলন করেন-ঐতিহাসিক সত্য (Historical Truth).

-বরফ পানিতে ভাসে-বৈজ্ঞানিক সত্য (Scientific Truth).

আর, ছেপটখালীর শিক্ষকের আন্ডারপ্যান্ট হারালে তিনদিন পর পাওয়া যায়- আজগবী সত্য (Fantastical Truth).

ছেপটখালী যোগদানের প্রথম সাপ্তাহে সেই রহস্য আমি উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি।

মাশুক : বলিস কি! কিভাবে?

আমি : একদিন সন্ধ্যায় স্কুলের পাশের দোকানে গিয়েছি। তুই তখন মনপ্রাণ উজাড় করে লজিং-এ পড়াচ্ছিলি। দৈবক্রমে ডাকাতকুল শিরোমণি, ওস্তাদে আজম, সর্দার-এ-ডাকু মা কাটা জমির ওরফে ডাকাত জমিরের সাথে দোকানে সাক্ষাত হয়েছিল। যার খ্যাতি পুরো উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত। এক নামে তাকে সবাই চিনে ও মানে।  উখিয়া থানায় রক্ষিত তার আমলনামায় রয়েছে ডজন খানেক মোকদ্দমা। মা কাটা জমির নামেই সে সর্বাধিক সমাদৃত। দলবল নিয়ে যখন গহিন অরণ্যের অাস্তানা থেকে লোকালয়ে আসত, তখন বাঘে-মহিষে একঘাটে জল খেত। হেনকোন ক্ষমতাবান ছিল না, তাকে নজরানা না দিয়ে সাগরে মাছ ধরার বোট নামাতে পারতো।
কুশল বিনিময়ের পর ছেপটখালী সরকারি প্রাইমারি স্কুলের নতুন শিক্ষক জেনে আদবের সাথে চা খাওয়ার অফার দিল। এতো বিখ্যাত ব্যক্তির চা’র অফার! আমি না করতে পারলাম না।
চা খেতে খেতে অনুসন্ধিৎসু মনে বললাম, জমির ভাই, বাল্যকাল থেকে আপনার নাম-যশ শুনে আসছি। উখিয়া উপজেলায় আপনার নাম শুনে নাই এমন কোন নারী-পুরুষ পাওয়া দায়। আমার সৌভাগ্য, কাকতালীয়ভাবে আপনার সাথে দেখা হয়ে গেল। যদি কিছু মনে না করেন, একটা বিষয় জানার খুব খায়েশ ছিল।

জমির : আপনি ঠিকই বলেছেন। সবাই আমাকে এক নামে চিনে। এই এলাকায় আমি কোন বিষয়ে কথা বললে কেউ দ্বিমত করার সাহস পায় না। স্কুলের সভাপতি কে হবে, কে মেম্বার হবে, কোন ভাই কোন ভাগের জমি চাষ করবে-সব আমাকেই দেখতে হয়। আপনারা মাস্টার মানুষ। আপনাদেরকে আমার খুব দরকার। আমি সিন্ধান্ত নিয়েছি, এইবার নিজেই ইলেকশন করবো। আপনারা তো সহকারি প্রিজারবেডিং অবিচার (প্রিসাইডিং অফিসার) থাকবেন। আপনাদের একান্ত সহযোগিতা আমার দরকার হবে।
“মা কাটা” উপাধিতে কখন, কি কারণে ভূষিত হলাম, তা জানতে চান নিশ্চয়?

আমি: নাহ্।

জমির: তাহলে কী জানতে চান বলেন দেখি?

আমি : আজ থেকে ১০/১২ বছর আগে ছেপটখালী স্কুলের মাস্টার হারুন আর মনখালী স্কুলের মাস্টার হাবিব—
জমির : বুঝেছি। ডাকাতের কবলে পড়েছিল, এইতো?
আমি : হ্যাঁ।
জমির : কারা করেছিল এইডা জানতে  চান?
আমি : নাহ্।
জমির : মাস্টার মানুষকে কেন ডাকাতি করল, এইডা জানতে চান।
আমি : নাহ্।
জমির : তাইলে?
আমি : ডাকাতির সময় ডাকাতরা দুই মাস্টারের মধ্যে একজনের টাকা পয়সা, কাপড়-চোপড় সহ সর্বস্ব ছিনিয়ে নিল, অপর জনের কিছুই নিল না । উল্টো তার পকেটে ১০ টাকা গুজে দিল, কারণ কি ? আবার তিন দিন পর ডাকাতির ঘটনাস্থলে মাস্টার সাহেবের আন্ডারওয়্যারটি পাওয়া গেল, তারিইবা হেতু কী?
জমির : ওহ্, এই কথা। বুঝেছি। শুনেন তাইলে .

……..…….. (চলবে)

লেখক-
অফিসার ইনচার্জ
লালমাই থানা, কুমিল্লা।
তাং-৩০-০৭-২০২০ খ্রিঃ।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15