সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১২:৩১ পূর্বাহ্ন

গুলিবিদ্ধ সিনহা অক্সিজেন চাইলে আরো ২টি গুলি করে লিয়াকত!

উখিয়া সংবাদ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম :: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২০
  • ২২

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পিকআপ ভ্যানে হাসপাতালে নেয়ার পথে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ বাঁচার জন্য অক্সিজেন চাইলে তাকে আরো দুটি গুলি করে পুলিশ কর্মকর্তা লিয়াকত।

বন্ধুদের কাছে এ কথা বলেছেন ওই পিকঅ্যাপের চালক আবুইয়া। আবুইয়ার বন্ধু সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালক এ বিষয়টি জানিয়েছেন।

অটোরিকশা চালক বলেন, ঘটনার পর সেই মিনি পিকআপ চালক বেলাল ওরফে আবুইয়া তাকে বলেছেন হাসপাতালে নেবার পথে সিনহাকে আরো দুই রাউন্ড গুলি করে পুলিশ।

তিনি বলেন, গাড়ি করে নিয়ে যাচ্ছিল। সে অবস্থায় গুলিবিদ্ধ লোকটি অক্সিজেন চেয়েছিল। তখন তাকে আবার দুইটি গুলি করা হয়।

এদিকে জানা গেছে, হাসপাতাল থেকে আসার পর অনেকটাই ভীতসন্ত্রস্ত ছিলেন আবুইয়া। তার পরিচিতজনরা জানান, গুলি করার ভয় দেখিয়ে তাকে এক পুলিশ কর্মকর্তা নিয়ে গেছে।

পরিচয় গোপন রেখে একজন বলেন, লাশ দেখে আবুইয়া ভয় পেয়েছে। শুধু এই কথাটুকুই বলেছে। ত্রিপলের মধ্যে রক্ত লেগেছিল। সেটা তার বাবা ধুয়ে দিয়েছে।

এছাড়াও পুলিশের করা এজহারে ঘটনাস্থলে ইন্সপেক্টর লিয়াকত আত্মরক্ষার্থে ৪ রাউন্ড গুলি করেছে বলা হয়েছে। তবে পুলিশের করা সুরতহালে সিনহার গায়ে ৬টি গুলির গভীর ক্ষতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেল ৩টার পর থেকে সিনহা হত্যা মামলার চার আসামিকে কক্সবাজার জেলা কারাগারের ফটকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) তদন্তদল। চার পুলিশ সদস্যকে দুদিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেল সুপার মোকাম্মেল হোসেন বলেন, আজ দুপুর দেড়টার দিকে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মেজর সিনহা রাশেদ হত্যা মামলার রিমান্ড ও জিজ্ঞাসাবাদের আদেশপ্রাপ্ত সাত আসামির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জেলা কারাগারে পৌঁছেছে। ফলে কারাফটকে র‌্যাব সদস্যরা চার আসামিকে বিকেলে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন। আগামীকাল রোববার সাত দিনের রিমান্ডের আদেশপ্রাপ্ত আসামিদের র‌্যাব হেফাজতে নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।

মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সাত পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। শুক্রবার তাদের বরখাস্ত করা হয়। তারা হলেন টেকনাফ থানার প্রত্যাহার হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, সিনহাকে গুলি করা পুলিশের পরিদর্শক লিয়াকত আলী, কনস্টেবল সাফানুর করিম, উপপরিদর্শক নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল কামাল হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন এবং সহকারী উপপরিদর্শক লিটন মিয়া।

প্রসঙ্গত, দুই বছর আগে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া সিনহা মো. রাশেদ খান ‘লেটস গো’ নামে একটি ভ্রমণ বিষয়ক ডকুমেন্টারি বানানোর জন্য গত প্রায় একমাস ধরে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকায় ছিলেন। আরো তিন সঙ্গীকে নিয়ে তিনি উঠেছিলেন নীলিমা রিসোর্টে। গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের কথা জানিয়ে সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিনহা তার পরিচয় দিয়ে ‘তল্লাশিতে বাধা দেন’। পরে ‘পিস্তল বের করলে’ চেক পোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ তাকে গুলি করে। এই ঘটনায় পুলিশ মামলাও করে। তবে পুলিশের এই ভাষ্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিনিধি নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এদিকে সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে বুধবার কক্সবাজারের আদালতে মোট ৯ পুলিশকে আসামি করে মামলা করেন তার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। আদালতের নির্দেশে বুধবার রাতেই মামলাটি টেকনাফ থানায় নথিভুক্ত হয়। এই হত্যা মামলায় বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে ১ নম্বর এবং টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে দুই নম্বর আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন- এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আবদুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, এএসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফা।

মামলার পর ওইদিন বিকালে টেকনাফ থানা থেকে ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে প্রত্যাহার করা হয়। পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ২০ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে পাঠানো হয় দুদিন আগেই। এ মামলায় বৃহস্পতিবার টেকনাফ থানা থেকে প্রত্যাহার হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, শামলাপুর তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিতসহ ৭ আসামির প্রত্যেককে র‌্যাব হেফাজতে সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। একই সঙ্গে পলাতক ২ আসামি এএসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফাকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

এজাহারে সিনহার বোন অভিযোগ করেন, ওসি প্রদীপের ফোনে পাওয়া নির্দেশে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই লিয়াকত আলী গুলি করেছিলেন সিনহাকে। এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় ‘ইচ্ছাকৃত নরহত্যা’, ২০১ ধারায় আলামত নষ্ট ও মিথ্যা সাক্ষ্য তৈরি এবং ৩৪ ধারায় পরস্পর ‘সাধারণ অভিপ্রায়ে’ অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০২ ধারার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ঘটনার সময় সিনহার সঙ্গে থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে (২১) মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছে। ঘটনার দিনই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, মাদক ও অস্ত্র আইনের মামলায় তাকেও আসামি করা হয়।

সিনহা নিহতের ঘটনায় জড়িত সব পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে বুধবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের সমিতি রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)। একই দিন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদ কক্সবাজারে গিয়ে সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, এই ঘটনায় যে এই ঘটনায় দায়ী হিসেবে যে বা যারা চিহ্নিত হবে, তারাই শাস্তি পাবে। এর দায় বাহিনীর উপর পড়বে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সিনহার মা নাসিমা আখতারকে ফোন করে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15