রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ০১:২৪ অপরাহ্ন

সিনহা হত্যার বর্ণনা দিলেন প্রত্যক্ষদর্শী সিফাত

উখিয়া সংবাদ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম :: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২০
  • ২৩

কক্সবাজারের শাপলাপুর চেকপোস্টে কী ঘটেছিল অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের সাথে? সিনহার মৃত্যু খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তার সফরসঙ্গী সিফাত। হত্যার সময় কি ঘটেছিলো সে বর্ণনা এবার উঠে এলো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সিফাতের মুখে।

সিফাত জানান, শামলাপুর চেকপোস্টে এপিবিএন ছেড়ে দিলেও কিছু দূর যাওয়ার পর ড্রাম ফেলে তাদের পথরোধ করে টেকনাফ থানা পুলিশ। সিফাতের দাবি, হাত উঁচু করে গাড়ি থেকে নেমেছিলেন সিনহা।

গত ৩১ জুলাই কক্সবাজার শামলাপুর চেকপোস্টে দায়িত্বরত এপিবিএন সদস্যদের তল্লাসি চৌকিতে গাড়ি থামান মেজর অবসরপ্রাপ্ত সিনহা মো. রাশেদ খান। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তারা ছেড়ে দিলেও ড্রাম ফেলে পথ রোধ করে টেকনাফ থানা পুলিশ। সিনহা হত্যার ঘটনার বর্ণনায় শুরুটা এমনই ছিলো সিনহা হত্যার সাক্ষী সিফতের মুখে।

সিফাত জানান, আমাদের হাতে ট্রাইপড ছিলো; সম্ভবত এটা তারা ভুল বুঝতে পারে। গাড়িতে নামার সময় আমাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিলো না। গাড়ি থেকে নামতেই গুলির শব্দ, তারপর মাটিতে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য। যেন কল্পনাকেও হার মানায় সেদিনের ঘটনা।

সিফাত বলেন, উনি (সিনহা) নামার সময়ে দুই হাত উঁচু করে নামেন। এরপর আমি পিছনে চলে যাই। কিন্তু গাড়ির কারণে আমি আর কিছু দেখতে পারি নাই। যখন নামেন তখন বলেন, কাল্ম ডাউন, কাল্ম ডাউন আওয়াজ শুনতে পাই। যে অফিসার বন্দুক তাক করেছিলেন (তিনি বলছিলেন)। এর ভিতরে গুলির শব্দ শুনি। পরে দেখি সিনহা সাহেব শুয়ে পড়েন; আমি ভাবছি; হয়-তো উনার শরীরে গুলি লাগেনি। ফাঁকা আওয়াজ হয়েছে। তারপর দেখি উনার শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে।

সিফাতের দাবি, সিনহার ব্যক্তিগত অস্ত্রটিও ছিলো গাড়িতে, সিনহা নেমেছিলেন হাত উঁচু করেই।

সেদিনের পুরো ঘটনার সাক্ষী সিফাত গত ১০ আগস্ট কক্সবাজার কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। যদিও পুরো ঘটনা সবার সামনে তুলে ধরতে খানিকটা সময়ও চেয়েছেন সিনহার সঙ্গী সিফাত ও শিপ্রা।

প্রসঙ্গত, দুই বছর আগে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া সিনহা মো. রাশেদ খান ‘লেটস গো’ নামে একটি ভ্রমণ বিষয়ক ডকুমেন্টারি বানানোর জন্য গত প্রায় একমাস ধরে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকায় ছিলেন। আরো তিন সঙ্গীকে নিয়ে তিনি উঠেছিলেন নীলিমা রিসোর্টে। গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন।

ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের কথা জানিয়ে সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিনহা তার পরিচয় দিয়ে ‘তল্লাশিতে বাধা দেন’। পরে ‘পিস্তল বের করলে’ চেক পোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ তাকে গুলি করে। এই ঘটনায় পুলিশ মামলাও করে। তবে পুলিশের এই ভাষ্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিনিধি নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এদিকে সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে বুধবার কক্সবাজারের আদালতে মোট ৯ পুলিশকে আসামি করে মামলা করেন তার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। আদালতের নির্দেশে বুধবার রাতেই মামলাটি টেকনাফ থানায় নথিভুক্ত হয়। এই হত্যা মামলায় বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে ১ নম্বর এবং টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে দুই নম্বর আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন- এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আবদুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, এএসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফা।

মামলার পর ওইদিন বিকালে টেকনাফ থানা থেকে ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে প্রত্যাহার করা হয়। পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ২০ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে পাঠানো হয় দুদিন আগেই। এ মামলায় বৃহস্পতিবার টেকনাফ থানা থেকে প্রত্যাহার হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, শামলাপুর তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিতসহ ৭ আসামির প্রত্যেককে র‌্যাব হেফাজতে সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। একই সঙ্গে পলাতক ২ আসামি এএসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফাকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

পুলিশের দায়ের করা মামলার তিনজন সাক্ষীর জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে র‌্যাব। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) নুরুল আমিন, আয়াছ উদ্দিন ও নিজাম নামে তিনজন সাক্ষীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাদের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে উপস্থাপন করলে প্রত্যেকের সাত করে রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

এজাহারে সিনহার বোন অভিযোগ করেন, ওসি প্রদীপের ফোনে পাওয়া নির্দেশে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই লিয়াকত আলী গুলি করেছিলেন সিনহাকে। এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় ‘ইচ্ছাকৃত নরহত্যা’, ২০১ ধারায় আলামত নষ্ট ও মিথ্যা সাক্ষ্য তৈরি এবং ৩৪ ধারায় পরস্পর ‘সাধারণ অভিপ্রায়ে’ অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০২ ধারার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ঘটনার সময় সিনহার সঙ্গে থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে (২১) মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছে। ঘটনার দিনই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, মাদক ও অস্ত্র আইনের মামলায় তাকেও আসামি করা হয়।

সিনহা নিহতের ঘটনায় জড়িত সব পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে বুধবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের সমিতি রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)। একই দিন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদ কক্সবাজারে গিয়ে সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, এই ঘটনায় যে এই ঘটনায় দায়ী হিসেবে যে বা যারা চিহ্নিত হবে, তারাই শাস্তি পাবে। এর দায় বাহিনীর উপর পড়বে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মঙ্গলবার সিনহার মা নাসিমা আখতারকে ফোন করে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15