বুধবার, ২৩ জুন ২০২১, ০৯:২৮ অপরাহ্ন

‘’আমি যখন শিক্ষক ছিলাম’’-মোহাম্মদ আইয়ুব

উখিয়া সংবাদ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম :: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২০
  • ৯৪

(৭ম অংশ)

ডাকাত মা কাটা জমির উৎসাহের সাথে বলতে শুরু করল। আমিও ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ করে একাগ্রচিত্তে শুনতে লাগলাম-

জমির: আমরা ডাকাতরা কিছু তরিকা মেনে চলি। আমাদের কিছু নৈতিক ফরমুলা আছে। ফরমুলার বাইরে এক কদমও এগুই না। হাজমরা যেমন সালাম করলেও যদ্দুর কাটে,না করলেও তাই কাটে। হাজম বিদ্যা রপ্ত করার পর তারা হাজমগিরি করে। হাজমগিরি করতে গিয়ে কারো গোড়াকর্তন করে ঠুঁটা (Incapable) করার রেকর্ড নেই। কারণ তারা হাজমকর্মে সিদ্ধহস্ত।
আমরা ডাকাতরাও ডাকাতি বিদ্যা অর্জন করে হাতে কলমে শিক্ষানবিশ কাল শেষ করে “ডাকাত” খেতাব অর্জন করি। আমাদের অলঙ্ঘনীয় ফরমূলার মধ্যে আছে-

ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে কোন মুর্দা (শব) দেখি অথবা কোন মুর্দার ঘর সামনে পড়ে তবে সেদিন ডাকাতি করি না।

আমি: কেন ? মৃত মানুষ কি ডাকাত ধরতে পারে ?

জমির : না। কারণ আমরা মৃত্যুকে ভয় করি। কোন মুর্দা সামনে পড়লে, আমাদের মস্তিস্ক মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদেরও একদিন এই ভাবে খালি হাতে মাটির নিচে চলে যেতে হবে। মাথায় মৃত্যুভয় ঢুকলে আর যা-ই করেন, ডাকাতি করা যায় না। তাই জিন্দা মানুষ দেখলে কোন সমস্যা নাই, মুর্দা দেখলেই আমাদের যাত্রা ভঙ্গ হয়।

আমি : বুঝেছি। তারপর-

জমির : ডাকাতি করার সময় শিকারের মধ্যে যদি কোন কানা/খোঁড়া,বধির এককথায় প্রতিবন্ধি থাকে, তবে তাকে ডাকাতি করি না। শত-সহস্র স্বর্ণমুদ্রা থাকলেও না। উল্টো তাকে কিছু গুঁজে দিতে হয়।

আমি : কেন জানতে পারি?

জমির :এটি আমাদের অলঙ্ঘনীয় তরিকার মধ্যে অন্যতম একটি। হাজমরা পয়গম্বরি সুন্নতি (খৎনা) কোন ছেলেকে খৎনা করে না। এরুপ ছেলেরও তো ঐডা থাকে, তবুও করে না। কারণ হাজমরা আল্লাহ, রসুল ও পয়গম্বরদের মানে।
তদ্রুপ আমরাও প্রতিবন্ধিদের সম্মান করি। প্রতিবন্ধি হয়েও তারা আমাদের মতো ডাকাতি করে না। প্রতিবন্ধিত্বকে জয় করে সদোপায়ে জীবিকা নির্বাহ করে। আর আমরা সুস্থ, সবল মানুষ হয়েও ডাকাতি করি। তারা আমাদের চেয়ে উত্তম। শুধু ডাকাতরা কেন, সকলের উচিত তাদের সম্মান করা। এবার বলুন, ঐ দুই মাস্টারের মধ্যে নিশ্চয় একজন প্রতিবন্ধি ছিল।

আমি : হ্যাঁ। মাস্টার হাবিবের একটি পা সামান্য ছোট। ঠিক আছে, আমার প্রথম প্রশ্নের জবাব পেলাম। এবার বলুন মাস্টার হারুনের আন্ডারওয়্যারটি কেন তিন দিনপর ঐ জায়গায় পাওয়া গেল?

জমির : ঐ দিনের অপারেশনে একজন নতুন রিক্রুট ছিল। ছেপটখালী,মনখালী ও চুয়ানখালী স্কুলের শিক্ষকদের ডাকাতি করা, আমাদের তরিকায় নেই। কারো আন্ডারপ্যান্ট নেওয়া আমাদের সম্পূর্ণ তরিকা বর্হিভূত। ঐ শালা না বুঝে সেদিন তরিকা লঙ্ঘন করেছিল। আর তারা যে শিক্ষক ছিল, এই কথাটিও ওস্তাদকে বলে নাই। তাই তার বিরুদ্ধে আমাদের ডাকাতনামা মোতাবেক শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল।

আমরা ডাকাতরা পাক-পবিত্র হয়ে, সুরা একলাস পড়ে, আল্লাহ-খোদার নাম নিয়ে বিসমিল্লাহ‌্ বলে ডাকাতি করতে বের হই। আন্ডারপ্যান্টে নাপাকি থাকার সম্ভাবনা থাকে। তাই আন্ডারপ্যান্ট নেওয়া আমাদের তরিকায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ঐ রিক্রুট বেটা না বুঝে,সেদিন নিয়েছিল,পরে সিনিয়রদের নজরে আসলে সেটি ঐ জায়গায় ফেলে দিয়েছিল। আর তিনদিন পর তা পাওয়া যায়।

আমি : মাথা নেড়ে সায় দিলাম- বুঝেছি।

জমির : (দোকানদারের উদ্দেশ্যে) মাস্টার সাবকে আরেক কাপ চা দাও।
আপনার কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো ? আরো কিছু কথা বলতে চাই।

আমি : না। আপনার বয়ান ভালোই লাগছে। বলেন-

জমির : আমরা ডাকাতরা তো রাতের অন্ধকারে পাক-পবিত্র হয়ে, দোয়া-কলমা পড়ে, আল্লাহ-খোদার নাম নিয়ে ডাকাতি করতে বের হই। যারা দিনের বেলায় অফিসের চেয়ারে বসে কলমের ভয় দেখিয়ে ডাকাতি করে, তাদের কথাতো কেউ জানতে চায় না।

এই ধরুণ, দা/ ছুরি দিয়ে মাছ- তরকারি কাটে, বাঁশ- গাছ কাটে, তখন এটি অস্ত্র না। একটি নিত্য প্রয়োজনীয় গৃহোপকরণ। আর এই দা/ ছুরি দিয়ে কাউকে ভয় দেখিয়ে কোন সম্পত্তি ছিনিয়ে নিলে ডাকাতি/দস্যুতা হয়। পুলিশ ধরে নিয়ে যায়, মামলা হয়। সেই দা/ছুরি অস্ত্র হয়ে যায়। যারা দিনের বেলায় অফিসের চেয়ারে বসে কলমের ভয় দেখিয়ে লাখ-লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়, সেটা ডাকাতি নয় কেনো ? সেই কলমও অস্ত্র হয় না কেনো ?

আমি : আসলেই তো, দা/ ছুরির ভয় দেখিয়ে ডাকাতি করলে, দা/ছুরি অস্ত্রে রুপান্তরিত হলে কলমের ভয় দেখিয়ে ডাকাতি করলে, সেই কলম অস্ত্র হবে না কেন ? অবশ্যই হবে (A Pen can be Turned in to a weapon also).

জমির: বাংলায় বলেন।

আমি : আপনার কথার সূত্র ধরে বলছি, একটি কলমও অস্ত্রে রুপান্তরিত হতে পারে।

জমির: তাহলে তাদের কাউকে ডাকাতির অপরাধে গ্রেফতার করতে শুনেছেন?
এই দেখুন, আমাদের পাড়ার মাস্টার নুরুল কবির স্যারের কথা। তিনি জীবনে কারো কাঁচা আইলে পা দেননি। মনখালী সরকারি প্রাইমারি স্কুলে প্রধান শিক্ষক ছিলেন। একদিন এক বড়কর্তা ডেকে বললেন, গয়ালমারা বদলি করবে। নইলে ৫০,০০০/-টাকা দিতে হবে। বেচারা শিক্ষক মানুষ ১,৬২৫/-টাকা মাসিক বেতন স্কেল। এতো টাকা একসাথে বাপের জনমেও দেখেননি। কি আর করার, চাকরি আরো পাঁচ/ ছয় বছর থাকতেই দুর্নীতির কাছে মাথা নত না করে অবসর নিয়ে একটি ফার্মেসির দোকান খুলেছেন।

আপনার কথায় আসি। আপনার বাড়ি উখিয়া সদরে। আপনাকে পোষ্টিং দিল ছেপটখালী। আমার প্রতিবেশী মাস্টার মহিবুল্লাকে পোষ্টিং দিলো কুতুপালং সরকারি প্রাইমারি স্কুলে। যদি মাস্টার মহিবুল্লাহকে ছেপটখালী আর আপনাকে কুতুপালং দিত, তবে দুইজনের জন্যই ভাল হতো। বাড়ি থেকে স্কুলে গিয়ে পড়াতে পারতেন। কিন্তু তা করল না। করবে কেন? আপনারা তো মালপানি দেন নাই। তাই ছেপটখালী এসে এতো কষ্ট ভোগ করতেছেন।
লক্ষ্য করুন, আমরা রাতের ডাকাতরা দা/ ছুরির ভয় দেখিয়ে ডাকাতি করি। প্রতিবন্ধিদের লাখ টাকা থাকলেও ডাকাতি করি না। লাশ দেখলে ভয় পেয়ে ডাকাতি করা থেকে বিরত থাকি। মাথায় মৃত্যুভয় ঢুকে মনকে পুত-পবিত্র করে তোলে।

আর দিনের বেলায় কলেমের ভয় দেখিয়ে যারা লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়, তারা বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, এমনকি প্রতিবন্ধি ভাতায় পর্যন্ত ভাগ বসায়।
তারা বে-ওয়ারিশ লাশ থেকেও ডাকাতি করে। দাফন-কাফনে ৫০০/-টাকা খরচ হলে কলমের খোঁচায় বিল করে৫০,০০০/-টাকা। মুর্দাকে জিন্দা দেখিয়ে ভাতা তুলে খায়। ওদের মৃত্যুভয় নেই।

আমরা দা-ছুরির ভয় দেখিয়ে ডাকাতি করে কোন রকম পেটে ভাতে জীবনযাপন করি। আর কলমধারী ডাকাতরা অল্প দিনেই কোটিপতি হয়ে যায়। তাদের কলম আগ্নেয়াস্ত্রের চেয়েও ভয়ঙ্কর।

আমি: দুইটাই ডাকাতি, একটা ছোট আরেকটা বড়। তবে, আপনার কথার সূত্র ধরে একটি কথা মনে পড়ে গেল, English Novelist and Playwright Edward Bulwer-Lytton এর ১৮৩৯ সালে প্রকাশিত ঐতিহাসিক নাটক-“Cardinal Richelieu”-তে বলেছিলেন “The pen is mighter than the sowrd” (অসির চেয়ে মসি বড়)। এই উক্তিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে। আপনার (ডাকাত মা কাটা জমিরের) এই উক্তটিও একবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। কলম অনক সময় আগ্নেয়াস্ত্রের চেয়েও ভয়ঙ্কর (Sometimes, the pen is damneder than the firearm.)

( Edward Bulwer-Lytton -কথাটি বলিয়েছিলেন Chief Miniser to King Louis XIII, Recheliu এর মুখ দিয়ে। তাই তার উক্তিটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্ববাসী উদাহরণ টানছে। ডাকাত মা কাটা জমিরের এই উক্তিটির পটভূমি সত্য এবং তাৎপর্যপূর্ণ হলেও আলোর মুখ দেখার সম্ভাবনা ক্ষীণ ।)

জমির: লেখকরাতো বেশির ভাগ কল্পনা থেকে লেখে থাকেন। আর আমি যা বলছি তা একদম পেট্টিকেল (Practical)। কেউ বিশ্বাস করুক বা নাই করুক, এটিই সত্য ।

আমি: উঠি এবার। আপনার সাথে দেখা হয়ে ভলোই হল। অনেক অজানা বিষয় জানলাম। ধন্যবাদ আপনাকে।
জমির: আপনাকেও ধন্যবাদ। যে কোন প্রয়োজনে আমাকে স্মরণ করবেন।

জমিরের সাথে কথা বলে বেশ মজা পেয়েছিলাম। অবশ্য, এর পর তার সাথে আর কখনো দেখা হয়নি।

মাশুক: মা কাটা জমিরের সাথে এতক্ষণ কথা বললি, তোর ভয় লাগে নাই?

আমি: না। কারণ, প্রচার আছে, তারা মাস্টারদের ইজ্জত করে।

আমরা জমিরের গল্প করতে করতে শ্বাপদসঙ্কুল ও ডাকাত অধ্যুষিত বন্যগিরি পথ অতিক্রম করে হোয়াইক্যং আরাকান সড়কে পা রাখলাম। হোয়াইক্যং থেকে উখিয়া ২২ কিলোমিটার। চান্দের গাড়িতে আধ ঘণ্টার পথ। হালকা নাস্তা সেরে লাইনে থাকা চান্দের গাড়িতে উঠে বসলাম।

ঘড়ির কাঁটায় রাত ৯.৩০। কিছুক্ষণ পর বাড়ি পৌঁছব।
ভাবছি, আকস্মিক আমাকে দেখে মা কতোটা খুশি হবে!
আর স্বপ্নরাজ্যের রাজ্যেশ্বরী শর্মিলার দেখাইবা পাবোতো? ……….(চলবে)

লেখক-

মোহাম্মদ আইয়ুব
অফিসার ইনচার্জ
লালমাই থানা, কুমিল্লা।
তারিখঃ ২০-৮-২০২০খ্রিঃ।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15