সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৬:১১ অপরাহ্ন

পোর্ট অব বার্সা ছেড়ে মেসি ভিড়ছেন পেপ বন্দরে!

উখিয়া সংবাদ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম :: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

ইতিহাসের পাতায় কোনোদিন এই শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হবে তা হয়তো দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি ফুটবল বিশ্ব। কিন্তু বাস্তবতায় সেই দুঃস্বপ্নের অন্ধকারেই ঢাকা পড়তে যাচ্ছে স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাব। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত বার্সা কর্তৃপক্ষের কাছে বিচ্ছেদের সেই অপ্রত্যাশিত পত্র পাঠিয়ে দিলেন ‘দ্য লিটল ম্যাজেশিয়ান’ খ্যাত ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তী, আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। জানিয়ে দিলেন, অভিমানি হৃদয়ের বিদায় বার্তা।

বাংলাদেশ সময় বুধবার (২৬ আগস্ট) মধ্যরাতে এমনি এক অপ্রত্যাশিত সংবাদের আকস্মিকতায় রীতিমত স্তব্ধ হয়ে পড়ে গোটা বিশ্ব মিডিয়া। মেসির একান্ত ঘনিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, বার্সা কর্তৃপক্ষের ড্রয়ারে পৌঁছে গেছে মেসির পাঠানো বিদায় বার্তা। লিও জানিয়ে দিয়েছেন, এবার সত্যি সত্যিই ন্যু ক্যাম্প ছাড়তে চান তিনি। আর মেসির এমন সিদ্ধান্তে পাশে দাঁড়িয়েছেন ক্লাব সতীর্থ উরুগুয়ান স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ।

এদিকে মেসির বার্সা ত্যাগের অপ্রত্যাশিত সংবাদ সামনে আসতেই মেসি পাগল হাজারো কাতালান সমর্থকের বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদে এক জ্বলন্ত অগ্নিগর্ভে পরিণত হয় রাতের বার্সেলোনা নগরী। অভিমানী মেসির ক্লাব ত্যাগের মূল কারণ হিসেবে সরাসরি অভিযোগ এনে, ক্লাবটির বর্তমান সভাপতি জোসেপ বার্তামেওর পদত্যাগের দাবি নিয়ে ফুটবল ক্লাবটির হোম গ্রাউন্ড ন্যু ক্যাম্পের বহিঃপ্রাঙ্গণে জড়ো হয় কয়েক হাজার কাতালান সমর্থক। সমর্থকদের এমন দাবির মুখে বেকায়দায় পড়েছে বার্সা বোর্ডও। আর তাতেই একেবারে কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন দীর্ঘ সময় ধরে বার্সেলোনায় নিজের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী সভাপতি বার্তামেও। প্রকাশিত এক সংবাদে এমন তথ্যই জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম মেট্রো।

জানা যায়, টানা কয়েক বছর ধরে টিম ম্যানেজমেন্ট, কোচিং এবং ক্লাব অপব্যবস্থাপনাসহ আরো নানা বিষয় নিয়ে চরম ক্ষোভে ফুঁসছিলেন মেসি। চলমান এসকল বিষয়কে কেন্দ্র করেই ক্লাব সভাপতির সঙ্গে ক্রমেই মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হয় লিও’র। মেসি শুধু বার্সার একজন খেলোয়াড়োই নন, মেসি-বার্সা এক অনবদ্য যুগলের অনন্য গাঁথা। আর তাই এ মৌসুমে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের কাছে লা লিগার শ্রেষ্ঠত্ব হারানোর পরই ক্লাবের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে সরব হয়ে ওঠেন লিও। তবে তার সহ্যের সকল সীমা ছাড়িয়ে যায়, সদ্য সমাপ্ত চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কোয়ার্টার ফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বায়ার্ন মিউনেখের কাছে ৮-২ গোলের লজ্জাজনক পরাজয়ের পর। সাম্প্রতিক পারফর্মেন্সে বার্সার জীর্ণদশাও তাতে বেশ পরিষ্কার হয়ে ওঠে। যার প্রেক্ষিতে বিষণ্ণ মেসি তার বিদায় বার্তা পাঠিয়ে দেন ক্লাব কর্তৃপক্ষের বরাবর।

অপরদিকে মেসির বার্সা ত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই তার পরবর্তী সম্ভাব্য গন্তব্য কোথায় হতে পারে সে নিয়ে শুরু হয়ে গেছে খোঁজ-অনুসন্ধান। এরইমধ্যে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ রানার্সআপ ফরাসি ক্লাব পিএসজি ও ইতালীয়ান ক্লাব ইন্টারমিলানসহ আরো কয়েকটি ক্লাবের ব্যাপারে গুঞ্জন শোনা গেলেও অধিকাংশ ফুটবলবোদ্ধাদের হিসেব বলছে, ক্যারিয়ারের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সময় কাটানো গুরু পেপ গার্দিওলার ছায়াতেই নিজের ঠাঁই উঁজে নিতে পারেন মেসি। সে হিসেব মিলে গেলে, পেপে’র বর্তমান পাঠশালা ইংলিশ প্রমিয়ার লিগের ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিই হতে পারে মেসির নতুন ঠিকানা। আর বোদ্ধাদের এই হিসেব যে একেবেরে ভুল নয় তা প্রমাণ করতেই এক চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে।

বুধবার (২৬ আগস্ট) ইএসপিএন-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য মতে জানা যায়, গেল সপ্তাহেই গুরু পেপ গার্দিওলার সঙ্গে এক ফোনালাপকালে সিটির বন্দরে নোঙর করার আভাস দিয়েছিলেন মেসি। আর তাঁর পরের সপ্তাহেই বার্সার বোর্ড টেবিলে পাঠিয়ে দিলেন বিচ্ছেদপত্র।

নিজেদের প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনে ইএসপিএন জানায়, বিশ্বের বড় বড় ফুটবল ক্লাবগুলোর মত মেসিকে পেতে নিজেদের ইচ্ছার কথা আগেই জানিয়ে ছিল গার্দিওলার ম্যানসিটি। তবে সেক্ষেত্রে যে বিশাল অংকের ট্রান্সফার বাজেট তাদের গুনতে হবে সেখানেই ছিল কিছুটা পিছুটান। বলা হয়েছিলো, কোনভাবে যদি ট্রান্সফার ফির ক্ষেত্রে বরফ গলানো সম্ভব হয় তবে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টাটুকু দিয়ে মেসিকে নিজেদের ঘরেই আনবে সিটিজেনরা। আর সেক্ষেত্রে তাদের তুরুপের তাস গুরু গার্দিওলা।
এদিকে ক্লোজিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চুক্তি বাতিল করে ফ্রি ট্রান্সফার ফিতে বার্সা ত্যাগের জন্য নিজের ইচ্চছার কথা জানিয়েছেন মেসি। সেক্ষেত্রে দুইয়ে দুইয়ে চারের হিসেব বেশ মিলে যাচ্ছে। তবে খরুচে ক্লাব পিএসজি কোচও আসন্ন মৌসুমে মেসিকে ফ্রান্স স্বাগত জানাতে চায় বলে নিজের ইচ্ছের কথা আগাম জানিয়ে রেখেছেন আর তাঁর এই ইচ্ছাপূরণে পিএসজি মালিকও বেশ ইতিবাচক বলেই জানা গেছে।

কথা ছিলো কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠা মেসি-বার্সা যুগলের বিচ্ছেদ হবে সেদিনই যেদিন ফুটবলই ছেড়ে দেবেন মেসি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের এসকল অব্যবস্থাপনা ও দল গঠনে মেসির অসন্তুষ্টি- ক্রমেই পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ক্লাব ছাড়ার এই কঠিন সিদ্ধান্ত জানাতে বাধ্য হন বার্সা অধিনায়ক।

২০০৪ সালে বার্সেলোনার হয়ে ক্লাব ফুটবলের মহামঞ্চে পদার্পণ ঘটে লিওনেল মেসি নামক এক লিকলিকে আর্জেন্টাইন বালকের। জটিল রোগাক্রান্ত মেসিকে শুধুই খেলুড়ে সত্ত্বা প্রকাশের সুযোগই দেয়নি বার্সা; সুচিকিৎসার মাধ্যমে তাকে গড়ে তুলেছে সক্ষম ফুটবলার হিসেবে। এরপর ফুটবলের সবুজ টার্ফে অপ্রতিরোধ্য মেসির ছুটে চলা, যার পায়ের প্রতিটি যাদুকরি টোকায় কেবলই বিস্ময়ে বিমোহিত হয়েছে ফুটবল দুনিয়া। আর ইতিহাসের পাতায় চলেছে রেকর্ড নথিভুক্তিতে সময়ের চরম ব্যস্ততা।

মেসি-বার্সার স্মৃতিকাতর সোনালি পাতায় রয়েছে অর্জনের বহু অবিস্মরণীয় গল্প। বার্সা যে অপাত্রে কন্যা দান করেনি প্রতিটি মৌসুমেই তা প্রমাণ করে দেখিয়েছে ফুটবলের এই মহাবিস্ময়। হেক্সা ব্যালন-ডি-অর জয়ী এই খুদে ফুটবল বিস্ময় প্রতিটি অর্জনে ছাড়িয়ে গেছেন নিজেকে। সেই সঙ্গে ক্লাবের ভাণ্ডারে সঞ্চিত হয়েছে ১০টি লা লিগা, ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সোনালি মুকুটসহ অনন্য আরো বহু অর্জন,। বার্সার ইতিহাসে তো বটেই একই সঙ্গে বিশ্ব ফুটবলের মহামঞ্চে সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম ফুটবলারের তকমা অর্জনে যোগ্য দাবিদার হিসেবে পেলে-ম্যারাডোনার মত জীবন্ত ফুটবল কিংবদন্তীদের রাজত্বেও হানা দিয়েছেন রোজারিয়োর খুদে লিও।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা গেছে, সদ্য পাওয়া মেসির এই চিঠির জবাবে এখনও কোনো বক্তব্য জানায়নি বার্সেলোনা কর্তৃপক্ষ।

এদিকে হৃদয় নিগঢ়ে জমাটবদ্ধ শূন্যতা হাহাকার তুললেও এখনি মেসিকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রত্যাশার পারদ শূন্যের কোটায় নামাতে নারাজ বার্সা সমর্থকরা। তবে প্রতিটি মুহূর্তে তাদের মনে উৎকন্ঠার কালো মেঘ হয়ে জমছে নানা প্রশ্ন। বার্সা কি তাদের শো-কেসে তুলে নেবে ১০ নম্বর জার্সি? নাকি মেসির চাওয়া-পাওয়ার ন্যায্যতা বিবেচনা করে যেকোনো মূল্যে তাকে বেঁধে রাখবে নিজের ঘরে, মেসির চেয়ে অমূল্য আর আছেই বা কি বার্সার ভাণ্ডারে? মেসি কিস সমর্থকদের মুখের দিক তাকিয়ে বদলে নেবে সিদ্ধান্ত? নাকি দুঃখ ভারাক্রান্ত মেসি তার দু’কাঁধ ঝুলিয়ে দিয়ে সত্যিই এবার ক্লান্ত চরণে চিরদিনের জন্য ছেড়ে যাবে ন্যু ক্যাম্পের ড্রেসিং রুম? আর তাদের এমন সব প্রশ্নের উত্তর কেবলই সময়ের জানা, তাই অপেক্ষা করতে হবে কখন সময়ের সে বার্তা জানা যাবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15