বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৭:০৩ অপরাহ্ন

জীবন শঙ্কায় খোকা, আশা ছেড়ে দিয়েছেন ডাক্তাররা

ডেস্ক রিপোর্ট :
  • আপডেট টাইম :: শুক্রবার, ১ নভেম্বর, ২০১৯
  • ৭২
চিকিৎসাধীন সাদেক হোসেন খোকা। পুরোনো ছবি

অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তার সুস্থ হওয়ার আশা অনেকটাই ছেড়ে দিয়েছেন ডাক্তাররা। তারা খোকার চিকিৎসা প্রায়ই বন্ধ করে দিয়েছেন।

সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের মেমোরিয়াল স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টারে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।

খোকাকে দেখতে ছুটে গেছেন তার ছেলে বিএনপির বৈদেশিকবিষয়ক কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। বাবার জন্য দোয়া কামনা করে তিনি বলেছেন, ‘বাবার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। আপনারা সবাই দোয়া করবেন।’

যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সাদেক হোসেন খোকার শারীরিক অবস্থা পরিবর্তনের আশা ছেড়ে দিয়েছেন সেখানকার চিকিৎসকরা। তারা খোকার সব চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়েছেন।

খোকার জীবনের শেষ ইচ্ছানুযায়ী অন্তিম সময়ে তাকে দেশে নেয়াও পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয়নি। পাসপোর্ট না থাকায় দেশে ফিরতে পারেননি তিনি। পরবর্তী সময়ে কী হবে, এ নিয়ে স্বজনরা বিভ্রান্তিতে আছেন।

ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ২০১৪ সালের ১৪ মে সপরিবারে নিউইয়র্ক চলে যান সাদেক হোসেন খোকা। তার পর থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সে একটি বাসায় দীর্ঘদিন ধরে থাকছিলেন বিএনপির এ নেতা।

ভিজিট ভিসার নিয়ম অনুযায়ী, ৬ মাস পর পর যাওয়া-আসা করে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বৈধ রাখার নিয়ম। ২০১৭ সালে খোকা ও তার স্ত্রী ইসমত হোসেনের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। তারা নিউইয়র্ক কনস্যুলেটে নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন পাসপোর্ট পাওয়ার ব্যাপারে কনস্যুলেট থেকে কোনো সদুত্তর দেয়া হয়নি।

হাসপাতালে খোকার পাশে আগে থেকেই আছেন তাঁর স্ত্রী ইসমত হোসেন, মেয়ে সারিকা সাদেক, ছেলে ইশফাক হোসেন। বাবার সংকটাপন্ন অবস্থার খবর পেয়ে ঢাকা থেকে তার বড় ছেলে ইশরাক হোসেনও নিউইয়র্কে ছুটে গেছেন।

বাবার সবশেষ শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ইশরাক হোসেন জানান, পুরো ফুসফুসে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে। অক্সিজেন দিয়ে তার বাবাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। লোকজন এলে কাউকে কখনো কখনো তিনি চিনতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে। গত কয়েক দিন থেকে তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে।

ইশরাক হোসেন বলেন, বড় হতাশা আর বিভ্রান্তির মধ্যে আছি। আব্বু-আম্মু দুজনেরই পাসপোর্ট নেই। কী করব, তাও বুঝে উঠতে পারছি না।

গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ১৮ অক্টোবর সাদেক হোসেন খোকাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৮ অক্টোবর তার স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটলে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির একাধিক নেতা জানান, সাদেক হোসেন খোকা দীর্ঘদিন ধরে কিডনির নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রায় তিন সপ্তাহ আগে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টারে ভর্তি করা হয় খোকাকে। সোমবার স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটলে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়।

স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টারে ভর্তি হওয়ার পর ২৭ অক্টোবর সাদেক হোসেন খোকার শ্বাসনালি থেকে টিউমার অপসারণ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, লাগাতার ওষুধ সেবনের ফলে খোকার মুখে ঘা হয়ে গেছে। তিনি খাবার খেতে পারছিলেন না। পরে তার শ্বাসনালিতে অস্ত্রোপচার করা হয়। এর পর তাকে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে হাসপাতালেই।

খোকার গুরুতর অসুস্থতার কথা জানিয়ে বুধবার দুপুরে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের দলের ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা ক্যান্সারে আক্রান্ত। তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় আছেন। তিনি আমাকে অনুরোধ করেছেন, দেশবাসীর কাছে তার জন্য দোয়া চাইতে। তার এ অনুরোধটি আপনাদের জানাতে বলেছেন।’

এদিকে গুরুতর অসুস্থ খোকা দেশে ফিরতে চান। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে টেলিফোন আলাপে দেশে ফেরার আকুতির কথা জানান এই মুক্তিযোদ্ধা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএনপি চেয়ারপাসনের মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান।

শায়রুল বলেন, হাসপাতালে যাওয়ার আগে সাদেক হোসেন খোকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে আক্ষেপ করে বলেছেন- জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। দেশের মাটিতে বিদায় হবে কিনা আল্লাহ জানেন। আমার জন্য দোয়া করো। পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে দোয়া চাওয়া হয়েছে জানিয়ে শায়রুল কবির বলেন, সাদেক হোসেন খোকার সুস্থতা কামনা করে বিএনপির নানা স্তরে দোয়া মাহফিল আয়োজন করা হচ্ছে। তার পরিবার দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছে।

একসময়কার বাম ঘরানার রাজনীতিবিদ বিএনপিতে যোগ দেন। বিএনপির বর্তমান কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান তিনি। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠক অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে ছিলেন। ঢাকার মেয়র হয়ে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ করেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি একাধিকবার মন্ত্রিসভার সদস্যও হন।

এদিকে সাদেক হোসেন খোকার আশু আরোগ্য কামনায় আজ সকালে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং ঢাকার সূত্রাপুর-কোতোয়ালি এলাকার বিভিন্ন মসজিদে দোয়া হবে।

২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন খোকা। ২৯ নভেম্বর ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে ঢাকা মহানগরের মেয়র ছিলেন তিনি। ২০১৪ সালের ১৪ মে মাসে সাদেক হোসেন খোকা চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যান। সেখানেই চিকিৎসাধীন আছেন। এ সময়কালে দেশে তার বিরুদ্ধে কয়েকটি দুর্নীতি মামলা হয়। এর কয়েকটিতে তাকে সাজাও দেয়া হয়েছে।

এদিকে সাদেক হোসেন খোকার অসুস্থতার খবরে আবেগতাড়িত হয়েছেন তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। বুধবার মির্জা আব্বাস তার ফেসবুক ওয়ালে সাদেক হোসেন খোকার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এতে তিনি লেখেন, ‘প্রিয় খোকা, এই মাত্র জানতে পারলাম যে, তোমার শরীর খুব খারাপ, তুমি হাসপাতালে শয্যাশায়ী। জানার পর থেকে আমার মানসিক অবস্থা যে কতটা খারাপ এই কথাটুকু কার সঙ্গে শেয়ার করব সেই মানুষটা পর্যন্ত আমার নেই। বিশ্বাস করো, তোমার শারীরিক অসুস্থতার কথা জানার পর থেকেই বুকের ভেতরটা কেন যেন ভেঙে আসছে। আমি বারবার অশ্রুসিক্ত হচ্ছি। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে দু’হাত তুলে তোমার জন্য এ বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করছি যে, তিনি অবশ্যই তোমাকে সুস্থ করে আমাদের মধ্যে ফিরিয়ে আনবেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15