মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২১, ০১:৪০ পূর্বাহ্ন

ক্ষুধাজয়ী জোসনার গল্প

উখিয়া সংবাদ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম :: মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০
  • ১৩

জোসনা বেগম। অভাবের সংসারে খেয়ে না খেয়েই বেড়ে উঠা। তিন ভাই-বোনের মধ্যে বড়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়। একদিকে প্রতিবন্ধী স্বামী আর অরেকদিকে সংসারে চরম অভাব। দারিদ্র্যতার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেড়ে উঠা জোসনার স্বপ্ন ছিল স্বামীর সংসারে হয়তোবা সুখের দেখা মিলবে।

কিন্তু সে স্বপ্ন এবার দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দিল। কি করবে এবার ভেবে পাচ্ছিল না জোসনা। শ্বশুরের ভিক্ষার রোজগারে চলতো সংসারের হাড়ি। এরই মধ্যে একে একে সংসারে আসে এক ছেলে আর দুই মেয়ে। তারা বড় হতে থাকে। হঠাৎ শ্বশুরের মৃত্যুতে বন্ধ হয়ে যায় সংসারের একমাত্র আয়ের পথ।

প্রতিবন্ধী স্বামী, শাশুড়ি আর এক ছেলে দুই মেয়ের সংসারের নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। কি করবে বুঝতে পারছিল না। পেটের ক্ষুধা মেটাতে পরের বাড়িতে ঝি এর কাজ শুরু করে। সেখান থেকে সামান্য রোজগার আর পাওয়া খাবার নিয়ে বাড়িতে এসে তুলে দিত ছেলে মেয়েসহ বাড়ির বাকি সদস্যদের মুখে।

এভাবে বেশিদিন চলেনি, বাধ্য হয়ে কাজ নেন ৬ কিলোমিটার দূরের একটি তুলা ফ্যাক্টারিতে। কিন্তু নারী হওয়ায় ঠিকমতো বেতন দিত না মালিক পক্ষ। পরে কাজ নেন কালীগঞ্জ শহরের হেলাই গ্রামের একটি প্যাকেট তৈরির কারখানায়। প্যাকেট তৈরি করে সামান্য আয়ের টাকায় কোনো রকমে সংসারর চলতে থাকে।

এর মধ্যে নিজে প্যাকেট তৈরির পরিকল্পনা করেন। স্থানীয় দুটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে প্রয়োজনীয় সারঞ্জাম কিনে বাড়িতে গড়ে তোলেন মিনি প্যাকেট তৈরির কারখানা। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দিনে দিনে পিছু হঠতে থাকে সংসারের অভাব।

শত বাধা পেরিয়ে ক্ষুধাকে জয় করা এ নারীর বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার অনুপমপুর গ্রামে। স্বামীর নাম গোলাম নবী। বাবার বাড়ি একই উপজেলার বকেগাছি গ্রামে। বাবার নাম আব্দুর রাজ্জাক।

এখন তার কারখানায় প্রতিদিন সাড়ে তিনশত প্যাকেট তৈরি করেন। সেখান থেকে মাসে প্রায় ১২ হাজার টাকা আয় রোজগার হয়। তার প্যাকেট তৈরি কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে আরো সাত দরিদ্র নারীর। যারা মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় করে। দুই বছর হলো এভাবেই চলছে তার প্যাকেট তৈরির কারখানা।

যা দিয়ে সংসারের খরচ চালিয়ে থাকার জন্য দুই রুমের পাকা ঘর করেছেন। প্যাকেট কাটার ইলেট্রিক যন্ত্রসহ সেলাই মেশিন কিনেছেন। এছাড়া ৪৫ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছেন স্বামীর জন্য চার্জার ভ্যানও। যা নিয়ে প্রতিবন্ধী স্বামী প্যাকেটের কাঁচামাল বাজার থেকে কিনে নিয়ে আসেন। আবার প্যাকেট তৈরির পর বাজারের বিক্রির জন্য নিয়ে যান।

জোসনার বড় মেয়ে পড়ছে স্থানীয় একটি মাধ্যমিক ব্যিালয়ের ষষ্ঠ শ্রেনিতে আর ছোট মেয়ে প্রঞ্চম শ্রেণিতে। সব বাধা পেরিয়ে ক্ষুধা জয় করার অবদান স্বরূপ জাপানভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড তাকে বিশেষ সম্মাননা প্রদানের জন্য নির্বাচিত করেছেন। আগামী ২৫ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে এই সম্মাননা প্রদান করবে।

জোসনা জানান, অভাবের সংসারে একটা সময় না খেয়ে দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে। এখন প্যাকেট তৈরির কাজ আমার সব অভাব দূর করে দিয়েছে। শুধু আমার অভাবই না এলাকার আরো সাত নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে আমার কারখানায়। এখন আমার স্বপ্ন আমার কারখানা আরো একটু বড় করতে চাই। যেখানে সমাজের পিছিয়ে পড়া দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থান হবে। যেখানে কাজ করে তাদের সংসারের অভাব সুখের আলো জ্বলবে।

তিনি জানান, পাশাপাশি আমার দুই মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চাই। আমার বাবা অভাবের সংসারে ভাতের অভাবে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয়। আমি আমার মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেব না। তাদের আমি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ করতে চাই।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15