মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২১, ০৯:০১ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ ::

মুজিববর্ষে গৃহহীনদের জন্য ঘর নির্মাণে দুই নম্বর ইট চেয়েছিলেন ইউএনও!

জামালপুর প্রতিনিধি ::
  • আপডেট টাইম :: বুধবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২১

মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রকৃত গৃহহীনদের বাড়ি বানাতে এক নম্বরের বদলে দুই নম্বর ইট ব্যবহার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায়। বিষয়টি নিয়ে নির্মাণ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা হওয়ায় ওই ইট ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ইটভাটা মালিককে নির্দেশ দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুল মুনসুর। তবে ইটভাটা মালিকের অভিযোগ, ইউএনও নিজে তার ভাটায় গিয়ে দুই নম্বর ইট পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে এসেছিলেন। সমালোচনা হওয়া এখন সে ইট ফিরিয়ে নিয়ে এক নম্বর ইট দিতে বলেছেন তিনি। এভাবে ইট পাল্টানোতে তিনি আনা-নেওয়ার খরচ দাবি করে বলেছেন, না হলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে জামালপুরের মাদারগঞ্জে প্রকৃত গৃহহীনদের জন্য ১২১টি বাড়ি নির্মাণের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। এজন্য সরকারিভাবে ২ কোটি ৬৯ লাখ ১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত প্রত্যেক ভূমিহীন এখানে দুই কক্ষের একটি বাড়ি পাবেন যাতে আরও থাকছে একটি রান্নাঘর এবং করিডোরসহ বাথরুম। বাড়িগুলো হবে সেমি-পাকা। অর্থাৎ বাড়ির দেয়াল হবে ইট সিমেন্টের। মেঝে হবে পাকা। জানালা হবে কাঠের এবং মাথার ওপরে থাকবে টিনের ছাদ। এমন প্রতিটি বাড়ি নির্মাণে সরকার থেকে ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বরাদ্দ কম থাকায় এ প্রকল্পে কোনও ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী ভূমি কর্মকর্তা দায়িত্ব নিয়ে এ প্রকল্পটি দেখভাল করছেন।

বানানো হচ্ছে গৃহহীনদের ঘরবানানো হচ্ছে গৃহহীনদের ঘরবানানো হচ্ছে গৃহহীনদের ঘর

সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলার ৬ নং আদারভিটা ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামে ১৫টি প্রকৃত গৃহহীন পরিবারকে বাড়ি দেওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে এসব বাড়ি করার জন্য যে জমিটি নির্বাচন করা হয়েছে সেটি বেশ নিচু। ফলে নিয়ম অনুযায়ী মেঝে পাকা করে দিলেও এ বাড়িগুলোতে বর্ষা বন্যায় পানি ঢোকার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশাসন থেকে স্থানীয় আদারভিটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে ‘কর্ম সৃজন প্রকল্পে’র শ্রমিক দিয়ে এসব ঘরের ভিটির মাটি কেটে উঁচু করে দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু, চেয়ারম্যান এবিষয়ে কোনও কাজ করেননি। তিনি লোক মারফত সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের জানিয়েছেন, সরকারিভাবে বাড়ির ভিটি উঁচু করার জন্য অতিরিক্ত কোনও বরাদ্দ নাই। তাদের বলা হয়েছে, ঘর নির্মাণ কাজ চলার সময়ে কেউ যদি নিজ গরজে ও নিজ খরচে তার বাড়ির ভিটি  উঁচু করতে চান তাহলে করে নিতে পারবেন। চেয়ারম্যানের দায়িত্বহীনতায় গৃহহীনদের অনেকেই  সুদে ঋণ নিয়ে ঘরে মাটি তুলছে। এতে তাদের ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা মাটি কাটা বাবদ ব্যয় হচ্ছে। তবে গৃহহীন সম্ভাব্য মালিকদের অভিযোগ, ঘরের ভিটির মাটি তোলার জন্য তাদের ঋণ করতে হচ্ছে। সুদে নেওয়া এই ঋণ কবে শোধ হবে তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন তারা।

তালিকা ভুক্ত রোকেয়া বেগম এই বলেন, মাটি কাটার জন্য এরইমধ্যে ১৫ হাজার টাকা সুদেও ওপর নিয়ে আংশিক মাটি কেটেছি। পুরো মাটিও কাটতে পারি নাই। আমার কী হবে?

এভাবে ঋণ নিয়ে ঘরের ভিটিতে মাটি তুলছেন শিলা, আলাতন, রোকন, লিটন প্রমুখ। তারা বলেন, আমাদের নামে সরকার ঘর বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু ঘরের ভিটি তৈরি করার জন্য যে টাকা প্রয়োজন সেটা বরাদ্দ নাকি দেয় নাই। এখন আমরা কী করবো? ঘরের মেঝে উঁচু করার জন্য মাটি না ফেললে পরে বর্ষা, বন্যায় পানি জমে থাকবে, মেঝে যাবে ফেটে। আর মাটি কাটার জন্য নিতে হচ্ছে সুদের ওপরে ঋণ। আমাদের তো কোনও জমা টাকা নাই। থাকলে তো সরকারকে আমাদের বাড়ি বানায়ে দেওয়া লাগতো না, আমাদের বাড়ি আমরাই বানাতে পারতাম। এই বিষয়টা কি সরকারের একটু বিবেচনা করার সুযোগ আছে?

তবে এ বিষয়ে আদারভিটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তাকে যে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সে তথ্য স্থানীয়রা জানেনই না।

এদিকে, বাড়ির ভিটি উঁচু মাটি নিয়ে অভিযোগের পাশাপাশি আরও বড় অভিযোগ উঠেছে, ঘর নির্মাণের জন্য কেনা ইট নিয়ে। সারাদেশে এক নম্বর ইট দিয়ে এসব ঘর নির্মাণ করা হলেও এখানে দুই নম্বর ইট ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। ঘর নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও নিশ্চিত করেছেন এসব ঘর বানাতে আনা হয়েছিল ২ নম্বর ইট। আর এসব দুই নম্বর ইট আনার জন্য যার হাতে নির্মাণের ভার সেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাই নির্দেশ দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন সরবরাহ করা ইটের ভাটামালিক।

এরমধ্যে এসব ইট দিয়ে ওই প্রকল্পের ১৫টি ঘরের মধ্যে ১টি ঘরের দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। তবে নির্মাণ অবস্থায় দেয়ালের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, গজারিয়া প্রকল্পে ওই ১৫টি বাড়ি নির্মাণ করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল মুনসুর নিজে মিতু ব্রিকসে গিয়ে ইট ভাটার মালিক আবুল কালামের সঙ্গে ৩ লাখ ২ নম্বর ইট কেনার জন্য চুক্তি করেন। এরপর সেখানে ১০ হাজার ২ নম্বর ইট সরবরাহ করেন ইটভাটা মালিক আবুল কালাম। পরে বিষয়টি জানাজানি ও সমালোচনা শুরু হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজেই এসব ইট ওই প্রকল্প থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ভাটা মালিক আবুল কালামকে চাপ দিতে থাকেন।

ইট ভাটার মালিক আবুল কালাম জানান,‘উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুল মুনসুর নিজে আমার ইট ভাটায় এসে ২ নম্বর ইট প্রতি হাজার ৬ হাজার ৫শ’টাকায় ক্রয় করেন। ৩ লাখ ইট কেনার চুক্তি করেন তিনি। আমি শুরুতে পাঠিয়েছিলাম ১০ হাজার। কিন্তু এখন তিনি আমাকে এসব ২নম্বর ইট ফেরত আনার জন্য বারবার চাপ প্রয়োগ করছেন।’

আবুল কালাম জানান,  ১ নম্বর ইটের দাম প্রতি হাজার ৮ হাজার ৫শ’ টাকা।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুল মুনসুরের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দুই নম্বর ইট প্রকল্পে ব্যবহারের কথা তিনি অস্বীকার করেছেন।

তিনি  বলেন, ‘আমার অজান্তেই দুই নম্বর ইটগুলো ভূমিহীন গৃহহীনদের ঘর নির্মাণের কাজে ঢুকে গিয়েছিল। সেটা আমি জানতে পেরে ইটগুলো ভাটায় ফেরত পাঠাই। পরে ১ নং ইট দিয়ে ঘর নির্মাণ করা হয়।

এসব বিষয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান ওবায়দুর রহমান বেলালের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যাদের নামে ঘর বরাদ্দ হয়েছে তারা ঘরের ভিটার মাটি কাটার টাকা দেবে না। আদারভিটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে ১৫টি বাড়ির মাটি কর্ম সৃজন প্রকল্পের শ্রমিক দিয়ে কেটে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা চেয়ারম্যান আরও বলেন, এই প্রকল্পে কোনও প্রকার অনিয়ম বা দুর্নীতি হলে সে যেই হোক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15