শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ০৯:০৮ অপরাহ্ন

মা আর ঘুম ভাঙাতে পারবেন না আবরারকে

উখিয়া সংবাদ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম :: মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৯
  • ৪২

ডেস্ক সংবাদ ::

ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিল দুই ছেলে। বড় ছেলে ঢাকায় ফিরবে বলে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলেছিলেন মা। ঢাকার ফেরার পথে তিন-চারবার কথাও হয় মা-ছেলের। ঠিকঠাক ঢাকায় পৌঁছে মাকে তা জানায় ছেলে। কিন্তু মাঝরাতে মায়ের কাছে খবর যায়, ছেলে অসুস্থ। মায়ের বুকটা ধক করে ওঠে। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে অন্তর।

তড়িঘড়ি করে ঢাকার দিকে ছোটেন পরিবারের লোকজন। ততক্ষণে চিরবিদায় নিতে হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। রোগ কিংবা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বিদায় নয়, তারই বিদ্যাপীঠের কিছু পাষণ্ডের নির্যাতনে প্রাণ হারান এই মেধাবী শিক্ষার্থী।

সতেজপ্রাণ ও সুস্থ-সবল ছেলেটি বাড়ি থেকে ফিরেছিল ঢাকায়। মায়ের চোখে ভাসে ছেলে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে গর্ভধারিণীর দিকে। রাত না পোহাতেই ছেলের মৃত্যুর খবর এল! শোকে পাথর হয়ে গেছেন আবরারের বাবা-মা। ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। এখন যে ঘুমে সন্তান, সেই ঘুম আর ভাঙাতে পারবেন না তারা। মা রোকেয়া খাতুন মূর্ছা যান বারবার।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা রোডের বাসিন্দা আবরারের বাবার নাম বরকত উল্লাহ। ছেলের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করার দাবি জানিয়ে মা রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘রবিবার সকালে আমি তাকে নিজে ঘুম থেকে ডেকে তুলি। সে ঢাকায় রওনা দেয়। বিকালে হলে পৌঁছে ছেলে আমাকে ফোন দেয়। এরপর রাতে অনেকবার ফোন দেই আমি। কিন্তু ফোন আর ধরেনি।’ ফুপিয়ে কাঁদতে থাকেন মা।

রবিবার ভোররাত চারটার দিকে বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলের সিঁড়ি থেকে আবরার ফাহাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আবরারের পরিবারের লোকজন ঢাকায় এসে জানতে পারেন, তাকে খুন করা হয়েছে। তারা ছুটে যান শের-ই-বাংলা হলের ১০১১ নম্বর রুমে, যেখানে থাকতেন তাদের সন্তান ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার। ছেলের শূন্য বিছানার চাদর বুকে জড়িয়ে কেঁদে ওঠেন বাবা।

আবরারকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসের সূত্রে তাকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরেছেন ছাত্রলীগের নেতারা। এ ঘটনায় বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ নয় নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। এ ছাড়া যে রুমে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে সেখান থেকে রক্তমাখা স্ট্যাম্প, লাঠি, চাপাতি উদ্ধার করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে কয়েকটি চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে আবরার তার স্ট্যাটাসে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয় তুলে ধরেছিলেন।

হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা জানান, রাত ১১টার দিকে আবরারকে তার রুম থেকে ডেকে নিয়ে যায় ছাত্রলীগের কয়েকজন। ফেসবুকের স্ট্যাটাসের সূত্রে শিবির সন্দেহে তাকে  জেরা করতে করতে পেটান নেতাকর্মীরা। তাতে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক ও নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একই বর্ষের মেফতাহুল ইসলাম জিয়নসহ কয়েকজন। এরপর ফাহাদের নিথর দেহ সিঁড়ির নিচে ফেলে রেখে তারা পালিয়ে যান।

পরে হলের অন্য শিক্ষার্থীরা সিঁড়ির নিচ থেকে আবরারকে কেন্টিনে নিয়ে রাখেন।  প্রভোস্টকে খবর দিলে তিনি এসে বুয়েটের চিকিৎসককে ডেকে পাঠান। আবাররকে পরীক্ষা শেষে চিকিৎসক জানান, তিনি বেঁচে নেই। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে তারা এসে ফাহাদের মৃতদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যায়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সোহেল মাহমুদ ময়নাতদন্তের পর জানান, আবরারের দেহে আঘাতের অনেক চিহ্ন পাওয়া গেছে। স্ট্যাম্প ও লাঠির আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে। রক্তক্ষরণ হয় তার শরীরের ভেতরে।

আবরার হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন তার সহপাঠীরা। বিক্ষোভ হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অনেক এলাকায়। আবরারের জেলা কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিচার দাবি করেছেন।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদ এ ঘটনায় গঠন করেছে তদন্ত কমিটি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এর প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে কমিটিকে।

ছাত্রলীগের কেউ এর সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে- বলেছেন ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ ঘটনায় বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বলেছেন, ‘ভিন্নমতের কারণে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করতে হবে এটা কেমন কথা! বিএনপি তো আমাদের বিরোধিতা করে। তাই বলে আমরা কি বিএনপির নেতাদের হত্যা করি?’

শিবির সন্দেহে পেটানো হয় আবরারকে

আবরারকে ‘শিবির’ সন্দেহে জেরা করার পর ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প দিয়ে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী পেটান বলে জানা গেছে। মারধরের সময় ওই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন বুয়েট ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু। তিনি বলেন, ‘আবরারকে শিবির সন্দেহে ডেকে আনা হয়। সেখানে আমরা তার মোবাইলে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার চেক করি। ফেসবুকে বিতর্কিত কিছু পেজে তার লাইক দেওয়ার প্রমাণ পাই। সে কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগও করেছে। শিবির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাই।’

কিন্তু আদতে শিবিরের কোনো কর্মী নন আবরার। তাদের পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক। আবরারের চাচা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক। হানিফ সাহেবের বিভিন্ন মিটিংয়েও আমরা যাই। আবরার এমনিতে তাবলিগে যেত। বুয়েটে ভর্তির পর দু-তিনবার সে তাবলীগে গিয়েছিল।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের বাড়ির পাশেই আবরারদের বাসা।

‘আবরার ফাহাদ ও ফাইয়াজ দুই ভাই ছিল। এত মেধাবী ও শান্ত ছেলে হয় না।’ বলছিলেন তাদের প্রতিবেশী ভাই মনির হোসেন। ‘তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। হঠাৎ আজ সকালে শোনার পর আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি ছেলেটাকে কেউ মেরে ফেলতে পারে। আমরা আমাদের সন্তানকে লেখাপড়া করতে দিয়ে তারা লাশ হয়ে আসবে সেটা আশা করি না।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিচারের আবেদন জানিয়ে মনির হোসেন বলেন, ‘আমাদের আমাদের সন্তানরা পড়তে গিয়ে আর যেন লাশ হয়ে না আসে সেই ব্যবস্থা করবেন প্রধানমন্ত্রী।’

পেটানোর সময় যারা ছিলেন

যে ২০১১ নম্বর কক্ষে আবরারকে পেটানো হয়, সেখানে থাকেন ছাত্রলীগের নেতারা। অভিযোগ করা হয়েছে, বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলের অনুসারী একদল নেতাকর্মী আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করে। আবরারকে জেরা ও পেটানোর সময় ওই কক্ষে অমিত সাহা, মুজতাবা রাফিদ, ইফতি মোশারফ ওরফে সকালসহ তৃতীয় বর্ষের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী ছিলেন। দ্বিতীয় দফায় তাকে পেটান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক ও নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একই বর্ষের মেফতাহুল ইসলাম জিয়নসহ কয়েকজন। তারা সবাই মেহেদী হাসান রাসেলের অনুসারী।

ছাত্রলীগের বুয়েট সম্পাদকসহ আটক নয়জন

আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের ৯ নেতাকে আটক করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণপদ রায়।

আটককৃতরা হলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফুয়াদ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক ও নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একই বর্ষের মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, ছাত্রলীগ নেতা রবিন, মুন্না, তানভীরুল আরেফিন ইথান, অমিত সাহা, আল জামি।

কৃষ্ণপদ রায় জানান, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ (সিসিটিভি), প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এসব যাচাই-বাছাই করে আবরার হত্যাকাণ্ডে প্রাথমিকভাবে ৯ জনের সম্পৃক্ততা মিলেছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে বিস্তারিত বলা যাবে।

 

সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে তালবাহানা, উদাসীন উপাচার্য!

এ ঘটনার সিসিটিভির ফুটেজ হল প্রশাসন গায়েব করে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা হল প্রাধ্যক্ষ্যের রুমের সামনে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের দাবি, সিসিটিভির ফুটেজ না দেখে তারা যাবেন না। এক পর্যায়ে হলের সব ফটকে তালা দেন শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে এগুলো রিকভারি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে হল প্রশাসন।

এদিকে কোনোভাবে সিসিটিভির ফুটেজ বিভিন্ন মাধ্যমে ইতিমধ্যে ফাঁস হয়ে গেছে। তাতে দেখা যায়, আহত আবরারকে পাজাকোলা করে কোথাও নিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন। তাদের পেছনে আরও কয়েকজন।

ক্যাম্পাসে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটলেও গতকাল দুপুর অবধি বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাননি। দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে উপাচার্যকে মুঠোফোনে কল দেন প্রাধ্যক্ষ। উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) কল রিসিভ করে জানান উপাচার্য অসুস্থ। তিনি ক্যাম্পাসে যেতে পারবেন না।

গ্রামের বাড়িতে দাফন

ঢাকা মেডিকেলে আবরারের ময়নাতদন্তের পর তাকে কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তার মরদেহ দাফন করা হবে জানিয়েছেন আবরারের মামাতো ভাই জহিরুল ইসলাম।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15