মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন

সেদিন দিল্লি ও লন্ডনে যা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু

জুলকার নাইন ★
  • আপডেট টাইম :: শুক্রবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২০
  • ৩৮

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন পৌঁছানোর পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি হোটেল ক্লারিজে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম সংবাদ সম্মেলন করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিনের সেই সংবাদ সম্মেলনে শুধু ব্রিটিশ নয়, বিশ্বের বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা সাংবাদিক উপস্থিত      ছিলেন। হোটেল লবিতে জনাকীর্ণ এই সংবাদ সম্মেলনে ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের জন্য আমাদের লড়াইয়ের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। পাকিস্তানের কারাগারের কনডেম সেলে আমি যখন ফাঁসির জন্য অপেক্ষা করছিলাম তখন বাংলাদেশের জনগণ আমাকে তাদের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছে।

আমি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বাধীনতাকামী সব রাষ্ট্র যারা আমাদের সমর্থন দিয়েছে তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বিশেষত ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড ও অন্যান্য পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্বাধীনতাকামী জনগণ যারা আমাদের সমর্থন জানিয়েছেন তাদের সবাইকে আমি ধন্যবাদ জানাই। আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগোষ্ঠীকেও তাদের সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই।

এখন আমি বাংলাদেশকে অতিসত্বর স্বীকৃতি দিতে এবং জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তিতে সমর্থন জানাতে সব দেশের প্রতি আহ্বান জানাই। ’ আধা ঘণ্টার কিছু কম সময়ের এই সংবাদ সম্মেলনের আগমুহূর্তে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চুরুটে আগুন ধরিয়ে নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর ২ মিনিটের লিখিত বক্তব্য শেষ করে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বিশ্বের আর কোনো দেশের মানুষকে বাংলাদেশিদের মতো স্বাধীনতার জন্য এতটা মূল্য দিতে হয়নি। আমিও একটি মুহূর্তের জন্য তাদের এই দুর্দশার কথা ভুলতে পারিনি।

তাই আমি দেশ ও দেশের বাইরে থাকা প্রত্যেক বাংলাদেশিকে ধন্যবাদ জানাই। অভিনন্দন জানাই মুক্তিবাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে। যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করা লাখ লাখ মানুষের শোকাহত পরিবারের প্রতি জানাচ্ছি সমবেদনা ও বিদেহী আত্মার মাগফিরত কামনা করছি। ’ এক ব্রিটিশ সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশে কী বীভৎসতা চালানো হয়েছে তা শুনলে আপনারা আশ্চর্য হবেন। লাখ লাখ মানুষকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, মাইলের পর মাইল যেভাবে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, বেঁচে থাকলে হিটলারও হয়তো লজ্জা পেতেন

’ পাকিস্তানের কারাগারে বন্দীত্বর বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এটা আমার জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়, ১০-১৫ বছর ধরেই আমি এর মধ্যে রয়েছি। একটা বিষয় মনে রাখবেন, যে নিজেই মরতে চায়, তাকে কেউ মারতে পারে না। ’ অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি ৩৫ বছর ধরে রাজনীতি করছি, আমি জানতাম, আমি যদি কারাগারেও যাই বা বেঁচে নাও থাকি বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনবেই। ’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমাকে যে কারাগারের যে সেলে রাখা হয়েছিল সেখানে সূর্যের আলো বা বাতাস কিছুই ঢুকত না, কোনো রেডিও বা খবরের কাগজও দেওয়া হতো না। বিশ্বের কোনো কিছুর সঙ্গেই আমার যোগাযোগ ছিল না। অবশ্য জুলফিকার আলী ভুট্টো আমার কাছে এসেছিলেন। তার মাধ্যমেই প্রথম জানতে পারি বাংলাদেশের সরকার গঠনের কথা, আমাকে প্রেসিডেন্ট করার কথা। ’ সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি সহায়তার জন্য সারা বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানাই। কারণ সুজলা-সুফলা বাংলাদেশে শুধু লাখ লাখ মানুষই মারা যায়নি, হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, রেলপথ ধ্বংস করা হয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, অর্থনীতিকে পুরো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আমি আবেদন জানাই দরিদ্র মানুষকে বাঁচানোর জন্য। ’ প্রশ্নকারী ব্রিটিশ সাংবাদিককে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ যে কতটা সম্পদশালী ছিল তা আপনারা জানেন। কিন্তু এক শ-দেড় শ বছরের বিদেশি শাসনে থেকে অনেক কিছুই হারিয়েছে বাংলাদেশ। আমি মনে করি ব্রিটিশ সরকারেরও এখন দায়িত্ব বাংলাদেশকে সহায়তা করা। কারণ বাংলাদেশের সম্পদ আহরণ করেই আজকের ব্রিটেনে অনেক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। সেই ঋণ আজ পরিশোধের সময় এসেছে। শুধু ব্রিটেন নয়, আমি সারা বিশ্বের প্রতি লাখ লাখ মানুষকে ক্ষুধার জ্বালা থেকে বাঁচানোর আহ্বান জানাই। ’ এর আগে সেদিন সকালেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পান। একটি পাকিস্তানি সামরিক বিমানে খুব গোপনে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেদিন সকাল ৭টায় বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রচারিত খবরে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিমানযোগে লন্ডনে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। ’ প্লেনটি বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর নেমে বঙ্গবন্ধু ভিআইপি লাউঞ্জে এলে তাকে ব্রিটিশ বৈদেশিক দফতরের উপস্থিত কিছু কর্মকর্তা স্বাগত জানান। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে ব্রিটিশ ফরেন অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা স্যার ইয়ান সাদারল্যান্ড উপস্থিত হয়ে জানান, ব্রিটিশ সরকার বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা দিয়েছে। সকাল ৮টার মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে ব্রিটিশ সরকারের সম্মানিত অতিথি হিসেবে লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হোটেল ক্লারিজে নিয়ে যাওয়া হয়। অল্প সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা (পরে প্রধানমন্ত্রী) হ্যারল্ড উইলসন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান হোটেলে। মুহূর্তে লন্ডনে খবর রটে যায় বঙ্গবন্ধু এখন লন্ডনে। এ খবর পাওয়ার পরে অন্যান্য শহর থেকে লোকজন এসে জমায়েত হয় হোটেলের সামনে। এমন পরিস্থিতি যে, রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, পুলিশও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। চারদিকে স্লোগান ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। ’ সবার চোখে আনন্দাশ্রু। আর বঙ্গবন্ধু হোটেল কক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে জানালায় দেখা দেন। কী অবস্থায় আছে দেশ তিনি ততক্ষণে জানতে পেরেছেন।   বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনে পৌঁছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ছিলেন লন্ডনের বাইরে। বঙ্গবন্ধুর পৌঁছানোর কথা শুনে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী হিথ ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ছুটে আসেন। প্রধানমন্ত্রী হিথ তাকে নজিরবিহীন সম্মান দেখান। ওইদিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথ নিজে তার কার্যালয়ের বাইরে এসে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ শেখ মুজিব গাড়ি থেকে বেরিয়ে না আসেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথ বঙ্গবন্ধুকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আর কীভাবে যুক্তরাজ্য সহযোগিতা করতে পারে? বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাদের সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে আপনি সহযোগিতা করতে পারেন। ’ হিথ তাঁর সচিবকে বিষয়টি দেখতে বললেন। তখন লন্ডনে সন্ধ্যা ৫টা। ততক্ষণে হিথের সচিব জানালেন, পরদিন সকাল ৭টা নাগাদ একটি ফ্লাইট তৈরি হয়ে যাবে। ভারত থেকে অনুরোধ করা হলো নয়াদিল্লি ও কলকাতায় যাত্রাবিরতি করার। অন্যদিকে ঢাকা থেকে বলা হলো দিনের আলোতে ফিরতে। পরদিন ৯ জানুয়ারি লন্ডন সময় সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে ঢাকায় ফেরার জন্য বঙ্গবন্ধু ওঠেন ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবহরের কমেট জেটে। সিদ্ধান্ত হয় বাংলাদেশে ফেরার পথে বিমানটি দুই ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করবে দিল্লিতে। সে হিসেবে বঙ্গবন্ধু নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে পৌঁছালে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভি.ভি. গিরি এবং প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী স্বাগত জানান। বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধু ইংরেজিতে ভাষণ দেন, তিনি বলেন, ‘আমার জন্য এটা পরম আনন্দের মুহূর্ত। বাংলাদেশ যাওয়ার পথে আমি মহান ভারতের ঐতিহাসিক রাজধানীতে যাত্রাবিরতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ আমাদের জনগণের সবচেয়ে বড় বন্ধু ভারতের জনগণ এবং আপনাদের মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী- যিনি কেবল মানুষের নয় মানবতারও নেতা, তাঁর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারের কাছে এর মাধ্যমে আমি আমার ন্যূনতম ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারব। ’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জনের অভিযাত্রা সমাপ্ত করতে আপনারা সবাই নিরলস পরিশ্রম করেছেন এবং বীরোচিত ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এ অভিযাত্রা অন্ধকার থেকে আলোয়, বন্দীদশা থেকে স্বাধীনতায়, নিরাশা থেকে আশায় অভিযাত্রা। অবশেষে আমি নয় মাস পর আমার স্বপ্নের দেশ সোনার বাংলায় ফিরে যাচ্ছি। এ নয় মাসে আমার দেশের মানুষ শতাব্দীর পথ পাড়ি দিয়েছে। ’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমাকে যখন আমার মানুষদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তখন তারা কেঁদেছিল; আমাকে যখন বন্দী করে রাখা হয়েছিল, তখন তারা যুদ্ধ করেছিল আর আজ যখন আমি তাদের কাছে ফিরে যাচ্ছি, তখন তারা বিজয়ী। আমি ফিরে যাচ্ছি তাদের কোটি বিজয়ী হাসির মাঝে। বিজয়কে শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করার বিশাল যজ্ঞে যোগ দেওয়ার জন্য, আমি ফিরে যাচ্ছি আমার মানুষের কাছে। আজ আমার হৃদয়ে কারও জন্য কোনো বিদ্বেষ নেই বরং আছে পরিতৃপ্তি। এই পরিতৃপ্তি মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের, অপ্রকৃতিস্থতার বিরুদ্ধে প্রকৃতিস্থতার, ভীরুতার বিরুদ্ধে সাহসিকতার, অবিচারের বিরুদ্ধে সুবিচারের এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভর বিজয়ের। জয় বাংলা! জয় হিন্দ!’ নয়াদিল্লির এই সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি শেষে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফেরার পরের গণসংবর্ধনার কথা আজ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2019 UkhiyaSangbad
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themesbaukhiyasa15